চা ও হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানির আড়ালে অর্থ সরানোর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য-দুবাইয়ে অনুমোদনহীন বিনিয়োগ; দুদক ও সিআইডির তদন্তে জেমকন গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালে শত কোটি টাকা বিদেশে পাচার, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই বিদেশে বিনিয়োগ, ভুয়া রপ্তানি চালান এবং হাজার কোটি টাকার ব্যাংকঋণ- এমন একাধিক গুরুতর অভিযোগে আলোচনায় এসেছে দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী জেমকন গ্রুপ। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) একটি বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদনে গ্রুপটির বিরুদ্ধে অন্তত ১০২ কোটি ১৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনুমোদনহীন বিনিয়োগের পাশাপাশি চা ও হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানির আড়ালে অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কোথাও ভুয়া রপ্তানি চালান, কোথাও রপ্তানি আয় দেশে না এনে বিদেশেই অর্থ আটকে রাখার মাধ্যমে মানিলন্ডারিংয়ের কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছে বিএফআইইউ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়াই ৬১ লাখ ৩৯ হাজার মার্কিন ডলার পাঠানো হয়, যার বাংলাদেশি মুদ্রামান প্রায় ৭৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এই অর্থ পরে বিদেশি প্রতিষ্ঠানে শেয়ারে রূপান্তর করে মালিকানা নেওয়া হয়। গোয়েন্দা সংস্থার ভাষ্য, এটি অনুমোদনহীন বিদেশি বিনিয়োগ এবং অর্থপাচারের সুস্পষ্ট আলামত।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনে জেমকন গ্রুপের চেয়ারম্যান আমেনা আহমেদ এবং পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ, কাজী ইনাম আহমেদ ও কাজী নাবিল আহমেদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও অর্থপাচারের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়্যারে নিবন্ধিত অ্যাগনেটা এলএলসি-তে কাজী আনিস আহমেদের ৭৫ শতাংশ মালিকানা রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই ওই প্রতিষ্ঠানে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাঠানো হয় এবং পরে তা শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে মালিকানা গ্রহণ করা হয়।
শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, যুক্তরাজ্যের টিটুলিয়া ইউকে লিমিটেড-এ প্রায় আড়াই লাখ ব্রিটিশ পাউন্ড এবং দুবাইভিত্তিক ডাবল কোর জেনারেল ট্রেডিং এলএলসি-তেও বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জেমিনি সি ফুড লিমিটেড-এর বিরুদ্ধে প্রায় ১৭ কোটি ১৫ লাখ টাকার হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানির নামে ভুয়া চালান ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদেশে রপ্তানি দেখানো চিংড়ি প্রায় এক বছর পর আবার দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। বিএফআইইউর মতে, পচনশীল পণ্য এত দীর্ঘ সময় পর ফেরত আসা স্বাভাবিক নয়; বরং এটি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে না আনার একটি কৌশল হতে পারে।
একইভাবে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট লিমিটেড-এর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা আটটি চালানের বিপরীতে প্রায় ৪ লাখ ১৩ হাজার মার্কিন ডলার বা প্রায় ৫ কোটি ৯ লাখ টাকা দেশে না আনার অভিযোগও রয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক একই পক্ষ হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটি পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হয়েছে।
কিছু রপ্তানি আয়ের অর্থ প্রকৃত আমদানিকারকের পরিবর্তে সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশে আনা হয়েছে। এতে সন্দেহ করা হচ্ছে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ ব্যবহার করে রপ্তানি আয়ের হিসাব সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, জেমকন গ্রুপের আর্থিক অবস্থাও উদ্বেগজনক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশের ১৯টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ২ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ১ হাজার ৭৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে, যা খেলাপির ঝুঁকিতে। এক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অন্য ব্যাংকের দায় পরিশোধ, গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অস্বাভাবিক অর্থ স্থানান্তর এবং ব্যবসার প্রকৃতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ লেনদেনের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিএফআইইউ।
প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে দুদক ইতোমধ্যে তিনটি মামলা করেছে। মামলার তথ্যে কাজী আনিস আহমেদের বিরুদ্ধে প্রায় ৮০ কোটি ৩৫ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ এবং ৭৯ কোটি ১৪ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। কাজী ইনাম আহমেদের বিরুদ্ধে ৩২ কোটি ৬৬ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ ও ৭৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে। কাজী নাবিল আহমেদের বিরুদ্ধেও পৃথক মামলা হয়েছে।
বিএফআইইউ প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন জানিয়েছেন, গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে বিএফআইইউ তদন্তে সহায়তা করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ নেই; অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে সংশ্লিষ্ট সংস্থা।


