বাংলাদেশের প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজস্ব দলীয়করণে করছে বিএনপি। কোনো আমলাতান্ত্রিক আড়াল না রেখে সরাসরি বিএনপি নিজের দলের সক্রিয় ও পদধারী নেতাদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে বসানো হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখা থেকে জারি করা পৃথক ১২টি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে একযোগে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্র সংস্কার, প্রশাসনকে দলীয়করণমুক্ত করা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে রাখার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এই নিয়োগ সরাসরি সাংঘর্ষিক।
একসঙ্গে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পদে বিএনপি-সংশ্লিষ্টদের নিয়োগ। নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকায় রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা এবং দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ পদধারীরা।
১. মো. সামসুল আলম
নির্বাচন কমিশনের সাবেক উপ-সচিব ও বিএনপির নির্বাচনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত সামসুল আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে। ১২ জনের তালিকায় তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক অঙ্গসংগঠনের ফ্রন্টলাইন পদধারী নেতা নন।
২. মো. সালাহ্উদ্দিন সরকার
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি। তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক পদে।
৩. মোহাম্মদ রাশেদুল হক
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক। তিনি পেয়েছেন বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড-বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব।
৪. মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক এবং রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র। তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে।
৫. এ টি এম আবদুল বারী ড্যানী
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক। তিনি এখন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান।
৬. মো. কামরুজ্জামান দুলাল
জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি। তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব পদে।
৭. আবদুল খালেক
বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি এখন বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন বিএসইসির চেয়ারম্যান।
৮. শামসুজ্জামান সুরূজ
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে।
৯. কাজী রওনাকুল ইসলাম টিপু
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক। তিনি বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়েছেন।
১০. মো. জাকির হোসেন সিদ্দিকী
জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি। তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে।
১১. বেনজীর আহমেদ টিটো
বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি এখন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন বিসিকের চেয়ারম্যান।
১২. মামুন হাসান
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক। তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে।
আওয়ামী লীগের আমলে দলীয়করণের ধরন ছিল তুলনামূলকভাবে পরোক্ষ। সাধারণত অবসরপ্রাপ্ত সচিব, অতিরিক্ত সচিব বা দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে রাষ্ট্রীয় সংস্থা, করপোরেশন ও কর্তৃপক্ষের শীর্ষ পদে বসানো হতো। তাঁদের রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তাঁরা সরাসরি রাজপথের সক্রিয় দলীয় নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিযোগ উঠেছে, সেই রাজনৈতিক আড়ালটুকুও আর রাখা হচ্ছে না। সরাসরি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা, বিভাগীয় নেতা এবং দলটির অঙ্গসংগঠনের সাবেক শীর্ষ নেতাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও নির্বাহী পদে বসানো হচ্ছে।
বিএনপির এই সরাসরি রাজনৈতিক নিয়োগ সেই অপ সংস্কৃতির আরও প্রকাশ্য ও নগ্ন সংস্করণ।
বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব বদলে যাওয়ার সংস্কৃতি নতুন নয়। তবে এবার যদি সরাসরি ক্ষমতাসীন দলের সক্রিয় নেতাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বসানোর নজির প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে প্রতিটি সরকারই একই পথ অনুসরণ করতে পারে।
আজ বিএনপির নেতারা নিয়োগ পেলেন, আগামী দিনে অন্য কোনো দল ক্ষমতায় এলে তারাও নিজেদের নেতাদের একইভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক করতে পারে।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায় এটাই কোন বাংলাদেশ, যেখানে দলীয়করণ বন্ধ হওয়ার কথা ছিল। বদলায়নি রাষ্ট্র দখলের দলীয়করণের পুরোনো সংস্কৃতি।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কোনো দলের পুরস্কার বিতরণের জায়গা নয়। রাষ্ট্রের চেয়ার দলীয় আনুগত্যের বিনিময়ে নয়, যোগ্যতা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে পূরণ হওয়াই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বাভাবিক নীতি।


