দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো উদ্যোগ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম, অতিমূল্যায়ন, চুক্তি লঙ্ঘন এবং দুর্বল তদারকির এমন এক বিস্ময়কর চিত্র উঠে এসেছে। বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তর (ফাপাড) এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর বিশেষ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকার অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ, সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন, চুক্তির শর্ত অমান্য এবং প্রকল্প তদারকিতে গুরুতর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার অভিযোগ উঠে এসেছে।
রূপপুর প্রকল্পের আওতায় নির্মিত গ্রিন সিটি আবাসন প্রকল্প অনিয়মের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ২৩০টি অডিট আপত্তির মধ্যে ১২০টিই এই প্রকল্পকে ঘিরে। নির্মাণসামগ্রী, যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র ক্রয়ে সরকারি নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থ পরিশোধের তথ্য পাওয়া গেছে। নিরীক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের আড়ালে কৌশলে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ ব্যয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে গত দুই বছরে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর অনিয়ম ধরা পড়ে গ্রিন সিটির বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম ও জেনারেটর ক্রয়ে। সরকারি মূল্য যেখানে প্রায় ২৭ কোটি টাকা, সেখানে একই সরঞ্জাম কিনতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ, একটি খাতেই অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৮৭ কোটি টাকা। এমনকি একটি ভবনের জন্য মাত্র ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা মূল্যের সরঞ্জামের বিপরীতে বিল পরিশোধ করা হয়েছে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় ভয়াবহ অসংগতির ইঙ্গিত বহন করে।
গ্রিন সিটির ২০টি ভবনের নির্মাণ ও ক্রয় কার্যক্রমেই প্রায় ২৯৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, আইএমইডির পরিদর্শন প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়নি এবং দ্বিতীয় ইউনিটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। প্রকল্প দপ্তরে হালনাগাদ কর্মপরিকল্পনা, অসমাপ্ত কাজের তালিকা কিংবা বাস্তবায়ন অগ্রগতির কার্যকর ব্যবস্থাপনার কোনো নির্ভরযোগ্য নথি পাওয়া যায়নি। এমনকি চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা জমা না দিলেও তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রমাণও মেলেনি।


