আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম
একদিন এই ভূখণ্ডের মানুষ স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছিল অকাতরে। স্বপ্ন ছিল এমন এক বাংলাদেশের, যেখানে মেধা হবে সম্মানের, পরিশ্রম হবে সাফল্যের চাবিকাঠি, আর একজন নাগরিক নিজের ভবিষ্যৎ গড়বে নিজের দেশেই। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে আজ একটি প্রশ্ন ক্রমশ আরও তীব্র হয়ে উঠছে, বাংলাদেশ কি এখনও তার তরুণদের সেই স্বপ্ন দেখাতে পারছে, নাকি তাদের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন এখন দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া?
আজকের বাংলাদেশে অসংখ্য তরুণের জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য আর কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ অর্জন নয়; বরং এমন একটি পাসপোর্ট, যার প্রতিটি ভিসার সিল নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি বহন করে। বিমানবন্দরের বিদায় আজ আর শুধু প্রিয়জনের বিচ্ছেদের মুহূর্ত নয়, অনেক পরিবারের কাছে সেটিই যেন সাফল্যের নতুন সংজ্ঞা। আত্মীয়স্বজনের অভিনন্দনের ভাষাও বদলে গেছে, ‘চাকরি হয়েছে’ খবরের চেয়ে ‘বিদেশে চলে গেছে’ সংবাদটি যেন অনেক বেশি গর্বের। এটি শুধু কিছু মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের গল্প নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গভীর আত্মজিজ্ঞাসা। কেন একজন শিক্ষিত, দক্ষ ও উদ্যমী তরুণ নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে গিয়ে দেশের মানচিত্রের বদলে পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের মানচিত্র খুলে বসে? কেন তার স্বপ্নের ঠিকানা ক্রমেই দূর দেশের কোনো শহর হয়ে ওঠে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য বৈধ পথে অর্থ প্রেরণের পরিমাণ গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবল অর্থের হিসাব নয়; এটি আস্থারও একটি প্রতিচ্ছবি। যখন হাজার হাজার পরিবার নিজেদের সারা জীবনের সঞ্চয় ব্যয় করে সন্তানকে দেশের বাইরে পাঠাতে প্রস্তুত হয়, তখন তারা শুধু একটি ডিগ্রি কেনে না, তারা একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের সম্ভাবনা কিনতে চায়।
সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, মানুষ কেবল বেশি আয়ের জন্য দেশ ছাড়ে না; তারা যায় সম্ভাবনার সন্ধানে। তারা এমন একটি সমাজ খোঁজে, যেখানে যোগ্যতার মূল্যায়ন হয়, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুযোগ থাকে, আইনের শাসনের প্রতি আস্থা থাকে এবং কঠোর পরিশ্রমের ন্যায্য প্রতিদান পাওয়ার বিশ্বাস জন্মায়। একজন তরুণ যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে কর্মজীবনের বাস্তবতায় প্রবেশ করে এবং দেখে দক্ষতার পাশাপাশি নানা অদৃশ্য বাস্তবতাও তার পথ নির্ধারণ করছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার মনে প্রশ্ন জাগে, এই পথের শেষ কোথায়? আবার সীমিত আয়ের সঙ্গে ক্রমাগত বেড়ে চলা জীবনযাত্রার ব্যয়, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তাকে বিদেশমুখী করে তোলে। তখন বিদেশ আর শুধু একটি দেশ নয়; সেটি হয়ে ওঠে একটি বিকল্প ভবিষ্যতের প্রতীক।
অবশ্য বিদেশের জীবনও মোটেও সহজ নয়। সেখানে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, নিঃসঙ্গতা, সাংস্কৃতিক অভিযোজনের চ্যালেঞ্জ এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রমাণ করার নিরন্তর সংগ্রাম। তবুও অনেকে সেখানেই থেকে যান। কারণ তাদের বিশ্বাস, আজকের কষ্ট আগামী দিনের স্থিতিশীলতা এনে দেবে। এই বিশ্বাসই একটি উন্নত রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ, আর তৃতীয় বিশ্বের দেশের জন্য অনুতাপের।
অথচ উলটোরথ বাস্তবতা খুব বেশি পুরোনো নয়। মাত্র বছর দুয়েক আগেও বাংলাদেশকে নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছিল প্রশংসার জোয়ার। টানা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক সূচকে অগ্রগতির কারণে বিশ্ব গণমাধ্যম ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার এক উদীয়মান শক্তি, এমনকি “Rising Tiger” হিসেবেও আখ্যায়িত করেছিল। একসময় যে দেশকে উন্নয়নের বিস্ময় বলা হতো, আজ সেই দেশকেই নানা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যে বাংলাদেশ একসময় নিজের সম্ভাবনার গল্প শুনিয়েছিল বিশ্বকে, আজ সেই বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণ নিজের ভবিষ্যতের গল্প লিখতে চাইছে অন্যের ভূখণ্ডে। এই বৈপরীত্যই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি।
মেধাকে কখনো নিয়ম বা বাধা দিয়ে আটকে রাখা যায় না। মেধা বিকশিত হয় সেই সমাজে, যেখানে ন্যায্য প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা, উদ্ভাবনের স্বাধীনতা এবং মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত থাকে। তাই মেধা ধরে রাখার উপায় বিদেশে যাওয়ার পথ সংকুচিত করা নয়; বরং এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে একজন তরুণ বিশ্বাস করতে পারে তার নিজের দেশেও তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের চেতনাও ছিল এমনই একটি রাষ্ট্র নির্মাণের যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ কিংবা মতের ভিন্নতা নয়, মানুষের যোগ্যতা ও শ্রমই হবে অগ্রগতির ভিত্তি। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অট্টালিকা, সেতু কিংবা মহাসড়কে নয়; তার সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষ, বিশেষ করে তার তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন, সাহস ও সৃজনশীলতায়। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন দেশের সবচেয়ে মেধাবী তরুণটি বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্তত একবার থেমে ভাবে, “আমার ভবিষ্যৎ এই দেশেও গড়া সম্ভব।” কারণ একটি রাষ্ট্রের সাফল্য কেবল অবকাঠামোর উচ্চতায় নয়, মানুষের আত্মবিশ্বাসে মাপা হয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্জিত হয়, যখন একজন নাগরিক নিজের মাটিতেই স্বপ্ন দেখতে সাহস পায়, ন্যায্য সুযোগ পায় এবং বিশ্বাস করতে শেখে এই দেশেও পরিশ্রমের মর্যাদা একদিন অবশ্যই মিলবে।
সেদিনই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে হবে স্বপ্নের বাংলাদেশ; বিদায়ের বাংলাদেশ নয়।
আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


