ভারতবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে শ্রীলঙ্কার ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না- নয়াদিল্লিকে এমন স্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছেন শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকে। বুধবার ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ অবস্থান জানান। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, শ্রীলঙ্কার এই ঘোষণা শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বার্তা নয়; বরং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে নয়াদিল্লির অবস্থানের তাৎপর্যও নতুন করে সামনে এনেছে।
তিন দিনের সরকারি সফরে মঙ্গলবার কলম্বোয় পৌঁছান রাজনাথ সিং। সফরের দ্বিতীয় দিনে প্রেসিডেন্ট দিসানায়েকের সঙ্গে বৈঠকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকের পর ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারে তিনটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়। এর আওতায় শ্রীলঙ্কার বিমানবাহিনীর ব্যবহৃত এল৭০ আকাশ প্রতিরক্ষা কামান আধুনিকায়ন করা হবে। পাশাপাশি দুই দেশের ন্যাশনাল ক্যাডেট কর্পস (এনসিসি) এবং ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের (এনডিসি) মধ্যে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ভারতের এই ঘনিষ্ঠতা বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে ভারত মহাসাগরীয় ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে। চীনা অর্থায়নে বড় অবকাঠামো প্রকল্প ও কৌশলগত বন্দর ব্যবহারের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই নয়াদিল্লির উদ্বেগের অন্যতম কারণ।
এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হাম্বানটোটো বন্দর। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার পর ২০১৭ সালে ৯৯ বছরের ইজারায় বন্দরটির নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে তুলে দেয় শ্রীলঙ্কা। বন্দরের আশপাশের বিপুল জমিও চীনা নিয়ন্ত্রণে যায়। ফলে ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও তীব্র হয়।
এই বাস্তবতায় কলম্বোর পক্ষ থেকে ‘ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ডে শ্রীলঙ্কার মাটি ব্যবহার করতে না দেওয়ার’ ঘোষণা নয়াদিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ভারত মহাসাগরের সামুদ্রিক যোগাযোগপথ ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের অবস্থান শ্রীলঙ্কার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা। একদিকে ভারত তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে কোনো দেশের ভূখণ্ড যেন ভারতের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ব্যবহার না হয়- সেই অবস্থানও স্পষ্ট করছে।
ভারতের দৃষ্টিতে, প্রতিবেশী দেশগুলোর স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা সরাসরি ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধিকে শুধু সামরিক সহায়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর সঙ্গে ভারত মহাসাগরে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কাঠামো এবং আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্নও জড়িত।
বৈঠকে সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় ‘ডিটওয়া’র পর ‘অপারেশন সাগর বন্ধু’র আওতায় ভারতীয় সহায়তার জন্য রাজনাথ সিংয়ের মাধ্যমে ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান দিসানায়েকে। শ্রীলঙ্কার পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে নয়াদিল্লির সহায়তা প্যাকেজেরও প্রশংসা করেন তিনি।
অন্যদিকে রাজনাথ সিং বলেন, ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ও সামুদ্রিক অংশীদার হিসেবে দুই দেশ নিজেদের উন্নয়ন, জনগণের কল্যাণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
একই দিনে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর নির্মাণ করা শ্রীলঙ্কার তিনটি বেইলি সেতুর উদ্বোধনও করেন দুই নেতা।
সব মিলিয়ে, কলম্বোর সাম্প্রতিক অবস্থান দেখিয়ে দিচ্ছে- ভারত মহাসাগরের কৌশলগত সমীকরণে নয়াদিল্লির নিরাপত্তা উদ্বেগকে উপেক্ষা করার সুযোগ ক্রমেই কমছে। শ্রীলঙ্কার প্রকাশ্য আশ্বাস একই সঙ্গে ভারতকে একটি কৌশলগত বার্তা দিচ্ছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর কাছেও স্পষ্ট করছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিতে ভারতের অবস্থান এখন কতটা গুরুত্বপূর্ণ।


