পদ্মা নদীর ভয়াল ভাঙন থেকে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদকে স্থায়ী সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত নদী তীর সংরক্ষণ প্রকল্প। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই সেই বাঁধের প্রায় ৪০ মিটার অংশ পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার ঘটনায় প্রকল্পের নির্মাণমান, নকশা, তদারকি ও সরকারি জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
গত ১২ জুলাই বিকেলে গাঁওদিয়া ইউনিয়নের গাঁওদিয়া বাজারসংলগ্ন এলাকায় হঠাৎ করেই বাঁধের একটি অংশে ধস শুরু হয়। প্রথমে কয়েকটি কংক্রিট ব্লক সরে গেলেও অল্প সময়ের মধ্যেই বড় অংশ নদীতে তলিয়ে যায়। মুহূর্তেই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নদীর তীরবর্তী পরিবারগুলো প্রয়োজনীয় মালামাল সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করে।
ক্ষতিগ্রস্ত অংশে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ও কংক্রিট ব্লক ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, শত শত কোটি টাকার একটি স্থায়ী প্রকল্প যদি দেড় মাসের মধ্যেই জরুরি সংস্কারের প্রয়োজন পড়ে, তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়নের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। স্থানীয় বিএনপির লুটপাট আর সীমাহীন দুর্নীতির কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ মানবেতর দুর্ভোগে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবু সালাম মোল্লা বলেন, “জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তৈরি স্থায়ী বাঁধ যদি প্রথম বর্ষাতেই ধসে পড়ে, তাহলে এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের সুফল কোথায়? আমরা চাই, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ বের করা হোক।”
আবু হানিফ বলেন, “এই বাঁধের ওপর ভরসা করেই আমরা ঘরবাড়ি রক্ষা হবে ভেবেছিলাম। এখন আগের চেয়েও বেশি আতঙ্কে আছি। শুধু জিওব্যাগ ফেলে সমস্যার সমাধান হবে না; পুরো প্রকল্পের মান যাচাই করতে হবে।”
নদীতীরের বাসিন্দা শাহিদা বেগম বলেন, “আগেও পদ্মার ভাঙনে সব হারিয়েছি। আবার সেই ভয় ফিরে এসেছে। আমরা চাই, এমন কাজ হোক যাতে বারবার ভাঙনের আতঙ্কে থাকতে না হয়।”
একটি স্থায়ী নদী রক্ষা প্রকল্প পরিকল্পনার সময় নদীর প্রবাহ, বর্ষাকালের পানির চাপ, তলদেশের পরিবর্তন ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া হয়। সে কারণে নতুন নির্মিত বাঁধের এত অল্প সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা প্রকল্পের নকশা, বাস্তবায়ন বা প্রাকৃতিক পরিবর্তন-কোনটি কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা কারিগরি তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
এলাকাবাসীর দাবি, শুধু জরুরি সংস্কার নয়, পুরো প্রকল্পের নির্মাণমান ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা যাচাই করতে একটি স্বাধীন কারিগরি তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। পাশাপাশি দায় নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশ আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।
দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে গাঁওদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আশপাশের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার এবং বিস্তীর্ণ আবাসিক এলাকা নতুন করে পদ্মার ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এখন প্রশ্ন একটাই- ৫২৭ কোটি টাকার প্রকল্প যদি দেড় মাসেই পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়, তবে এর দায় নেবে কে? সেই উত্তর জানতে অপেক্ষায় স্থানীয় মানুষ।


