আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম
একটি ট্যাংক বিস্ফোরিত হয়েছিল ২০২৪ সালে। তার আগে একই ধরনের গোলাবারুদে আরও দুটি ট্যাংকে বিপজ্জনক ত্রুটি ধরা পড়েছিল। তখনই যদি সতর্ক হওয়া যেত, তাহলে ২০২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের বিস্ফোরণে কি দুই সেনাসদস্যের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর আজ সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক।
চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে ৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের সময় বিস্ফোরণে দুই সেনাসদস্য নিহত এবং একজন কর্মকর্তা গুরুতর আহত হয়েছেন। সামরিক প্রশিক্ষণে দুর্ঘটনা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু যখন একই ভূখণ্ডে, একই ধরনের অস্ত্রব্যবস্থায়, কয়েক বছর আগে গুরুতর দুর্ঘটনার ইতিহাস সামনে আসে, তখন সেটিকে আর নিছক দুর্ভাগ্য বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ২০২৪ সালের ৪ মে চট্টগ্রামে একটি টি ৫৯জি বা ‘দুর্জয়’ ট্যাংকে ভয়াবহ দুর্ঘটনার কথা উঠে এসেছে একটি প্রচারিত চীনা সামরিক প্রযুক্তিগত তদন্ত নথিতে। নথিটির দাবি অনুযায়ী, একজন লোডার নিহত হয়েছিলেন এবং ট্যাংকের কমান্ডার ও গানার আহত হয়েছিলেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একই নথিতে এর আগে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামের ফায়ারিং প্রশিক্ষণে ছয়টি ট্যাংকের মধ্যে দুটিতে ফায়ারিংয়ের পর ব্রিচব্লক জ্যাম হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানেই গল্পটি নিছক একটি দুর্ঘটনার থাকে না। এটি হয়ে ওঠে একটি সতর্কবার্তার গল্প। চীনা নথির দাবি, ওই ত্রুটির পর চীনা বিশেষজ্ঞরা পাকিস্তানে তৈরি গোলাবারুদ ব্যবহারের ঝুঁকির কথা বাংলাদেশকে জানিয়েছিলেন। মে মাসের দুর্ঘটনার পরও তারা ওই গোলাবারুদের ব্যবহার স্থগিত করার পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এমনকি ঘটনাস্থলে পাওয়া পাকিস্তানি ১২৫ মিলিমিটার এপি গোলার স্টিলের বেসে অস্বাভাবিকতা থাকার কথাও সেখানে বলা হয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বিদেশি তদন্ত নথিতে এমন গুরুতর অভিযোগ উঠে এলে সেটিকে নীরবতার অন্ধকারে ফেলে রাখাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় হতে পারে না। বরং তখনই প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশের নিজস্ব তদন্ত। প্রয়োজন ছিল ২০২৪ সালের দুর্ঘটনার কারণ প্রকাশ করা। প্রয়োজন ছিল ব্যবহৃত গোলাবারুদের ব্যাচ পরীক্ষা করা। প্রয়োজন ছিল পাকিস্তানি গোলাবারুদ ও চীনা ট্যাংকের কারিগরি সামঞ্জস্য পুনর্মূল্যায়ন করা। প্রয়োজন ছিল প্রতিটি টি-৫৯জি ইউনিটকে সতর্ক করা। প্রয়োজন ছিল ফায়ারিংয়ের আগে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কঠোর পরীক্ষা।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন, এসবের কতটা হয়েছিল? আর যদি হয়ে থাকে, তাহলে ২০২৬ সালের দুর্ঘটনা কেন ঘটল?
চীনা নথিতেই অপারেশনাল ভুল, নিরাপত্তা প্লেট না থাকা এবং কিছু প্রয়োজনীয় পরীক্ষা না করার মতো বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে সম্ভাব্য দায়ের জায়গা একাধিক। পাকিস্তানি গোলাবারুদের মান, ট্যাংকের নকশা ও রক্ষণাবেক্ষণ, অপারেশনাল পদ্ধতি এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনা সবকিছুই তদন্তের আওতায় আসতে হবে। কারণ একটি আধুনিক সেনাবাহিনীর শক্তি শুধু তার ট্যাংকের সংখ্যা কিংবা কামানের ক্যালিবারে নয়; তার প্রকৃত শক্তি হলো নিরাপত্তা সংস্কৃতি।
একটি দুর্ঘটনা ঘটলে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান প্রশ্ন করে, কেন ঘটল! দ্বিতীয়বার যাতে না ঘটে, তার ব্যবস্থা নেয়। আর যদি একই ধরনের বিপদ আবার ফিরে আসে, তখন প্রশ্ন ওঠে, প্রথম দুর্ঘটনা থেকে আমরা আসলে কী শিখেছিলাম? ২০২৪ সালের একজন লোডারের মৃত্যু এবং ২০২৬ সালের দুই সেনাসদস্যের মৃত্যু তাই আলাদা দুটি ঘটনা হিসেবে দেখলে হয়তো অনেক কিছুই চোখ এড়িয়ে যাবে। কিন্তু যদি তাদের মাঝখানে থাকা সতর্কবার্তাগুলোকে পাশাপাশি রাখা হয়, তাহলে একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে আসে। ‘আমরা কি সতর্ক হয়েছিলাম, নাকি শুধু শোক করেছিলাম?’
সেনাবাহিনীর গোপনীয়তা ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই আছে। কিন্তু গোপনীয়তা কখনোই নিরাপত্তা ঘাটতি আড়াল করার অজুহাত হতে পারে না। কোন তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব, আর কোনটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কারণে প্রকাশযোগ্য নয়, সেই সীমারেখা রাষ্ট্রই নির্ধারণ করবে। কিন্তু অন্তত সেনাদের জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় তদন্ত, সতর্কতা এবং সংশোধনী ব্যবস্থা হয়েছে কি না, তার উত্তর অবশ্যই থাকতে হবে।
ব্যাপারটা চীনা ট্যাংক বনাম পাকিস্তানি গোলা নয়। আসল প্রশ্ন বাংলাদেশের প্রস্তুতি বনাম বাংলাদেশের অবহেলা। কারণ ট্যাংক চীনের হতে পারে, গোলা পাকিস্তানের হতে পারে, প্রযুক্তি অন্য দেশের হতে পারে। কিন্তু সেই ট্যাংকের ভেতরে বসে থাকা মানুষটি বাংলাদেশের সন্তান। তার জীবন রক্ষার শেষ দায়িত্ব বাংলাদেশেরই। ২০২৪ যদি সতর্কবার্তা হয়ে থাকে, তাহলে ২০২৬ সালের দুইটি লাশ সেই সতর্কবার্তার ভয়ংকর মূল্য। এবার অন্তত প্রশ্নগুলো চাপা না পড়ুক। ২০২৪ সালের দুর্ঘটনা সত্যিই ঘটেছিল কি না, ঘটলে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কী বলেছিল, কী কী সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়িত হয়েছিল কি না, ব্যবহৃত গোলাবারুদের উৎস ও ব্যাচ কী ছিল এবং ২০২৬ সালের দুর্ঘটনার সঙ্গে পূর্ববর্তী ঘটনাগুলোর কোনো প্রযুক্তিগত যোগসূত্র আছে কি না, তার উত্তর বের করা হোক।
সৈনিকের মৃত্যু কোনো পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি মৃতদেহ একটি প্রশ্নপত্র। আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সেই প্রশ্নপত্রের উত্তর দেওয়া। দুই বছর আগে যদি আগুনের গন্ধ পাওয়া গিয়ে থাকে, তাহলে এবার অন্তত সেই গন্ধকে আর অবহেলা করা যাবে না। কিছুতেই না।
আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


