আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমশ নিচের দিকে নামছে বাংলাদেশের অবস্থান, প্রশ্নের মুখে কূটনৈতিক সক্ষমতা ও বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা
গত ৫ই আগস্ট ২০২৪-এ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে যে অস্থিরতা ও পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তার প্রভাব দেশের বিভিন্ন খাতে পড়েছে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো দেশের পাসপোর্ট র্যাংকিং।
সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান উগান্ডার চেয়েও ২৭ ধাপ পিছিয়ে রয়েছে। শুধু তাই নয়, যুদ্ধ ও দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত উত্তর কোরিয়ার চেয়েও বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবস্থান নিচে।
একটি দেশের পাসপোর্টের শক্তিমত্তা শুধু নাগরিকদের বিদেশ ভ্রমণের সুবিধা দিয়ে বিচার করা হয় না। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে দেশটির আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক, বৈশ্বিক আস্থা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতা। কোনো দেশের নাগরিকরা যত বেশি দেশে ভিসা ছাড়াই বা ভিসা অন অ্যারাইভাল সুবিধায় প্রবেশ করতে পারেন, সাধারণত সেই দেশের পাসপোর্টকে তত শক্তিশালী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট র্যাংকিংয়ের এই অবনমনকে তাই নিছক একটি পরিসংখ্যান হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকগণ। তাদের মতে, ৫ই আগস্ট ২০২৪-এর পর দেশের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অবস্থানের পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন সূচকে।
একসময় বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ডিজিটাল রূপান্তর, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গত এক দশকে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছিল। ফলে দেশের নাগরিকদের আন্তর্জাতিক চলাচল ও ভ্রমণ-সুবিধা বাড়বে- এমন প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসন, বিনিয়োগ, কূটনীতি, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অস্থিরতা সামনে এসেছে। এরই মধ্যে পাসপোর্ট র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার তথ্য সেই উদ্বেগকে আরও গভীরতর করেছে। বিশেষ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত উত্তর কোরিয়া এবং অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা উগান্ডার মতো দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবস্থান নিচে নেমে যাওয়ার বিষয়টি চরম উদ্বেগের। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি দ্রুত অগ্রসরমান দেশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছিলো শেখ হাসিনার নেতৃত্বে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি দেশের পাসপোর্টের শক্তি অনেকাংশে নির্ভর করে সেই দেশের সঙ্গে অন্যান্য রাষ্ট্রের সম্পর্কের ওপর। কূটনৈতিক সম্পর্ক যত শক্তিশালী হয়, নাগরিকদের জন্য ভিসা সুবিধা তত সহজ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিপরীতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক আস্থার সংকট এবং কূটনৈতিক দুর্বলতা পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
তাই বাংলাদেশের পাসপোর্ট র্যাংকিংয়ে এই পতন দেশের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা বলেই মনে করছেন অনেকে। কারণ, এর অর্থ শুধু এই নয় যে বাংলাদেশের নাগরিকদের বিদেশ যেতে বেশি ভিসা-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এর অর্থ হলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চোখে বাংলাদেশের নাগরিকদের চলাচল এখনো যথেষ্ট সীমাবদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক আস্থার জায়গায় দেশের অবস্থান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই।
৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের অন্যান্য খাতে অবনতির অভিযোগের পাশাপাশি পাসপোর্ট র্যাংকিংয়েও এই পিছিয়ে পড়া তাই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে- বাংলাদেশ কেন তার আগের আন্তর্জাতিক অবস্থান ধরে রাখতে পারছেনা? রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে বিশ্বপরিসরে দেশের অবস্থান ক্রমশ নিচের দিকে নামছে কেন?
উগান্ডার চেয়েও ২৭ ধাপ পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের পাসপোর্ট র্যাংকিং সেই প্রশ্নেরই এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি হিসেবে সামনে এসেছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার বদলে বাংলাদেশ যদি ক্রমাগত পিছিয়ে যেতে থাকে, তবে এর প্রভাব শুধু আন্তর্জাতিক ভ্রমণেই নয়, অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কূটনীতি এবং দেশের সামগ্রিক বৈশ্বিক ভাবমূর্তিতেও বাংলাদেশের অবস্থান তলানীতে।


