আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আয়নায় নিজের মুখ দেখা যায় না, দেখা যাচ্ছে ‘প্রকৃত’ রাষ্ট্রের মানসিকতার ছায়া। সেই ছায়া যখন এতটাই অদ্ভুত হয়ে ওঠে যে হাসব, না কাঁদব সেটা বুঝে ওঠা কঠিন হয়ে যায়।
আজ একটি খবর শুনে তেমনই হাসি পেল। খবরের বিষয়টি নিছক একটি চাকরি না পাওয়ার ঘটনা নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্র, রাজনীতি, পরিচয় এবং আনুগত্যের এক অদ্ভুত সমীকরণ। প্রকাশ্য সরেজমিনে জানা যাচ্ছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের পুলিশ ভেরিফিকেশনের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার যাচাইও যুক্ত হয়েছে। তবে হিন্দু প্রার্থীদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বাদ দেওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে।
যেসব হিন্দু তরুণ-তরুণী গত ৫ই আগস্টের প্রবল জঙ্গী হামলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নির্বাসিত করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাতদিন ‘হাদী ভাই’, ‘ভাইয়ের স্বপ্ন’, ‘খুনি হাসিনা’, ‘ভারতের আধিপত্যবাদ’ ইত্যাদি নিয়ে পোস্ট করেছেন; যারা আওয়ামী লীগবিরোধিতা এবং ভারতবিরোধিতাকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রকাশ্য অংশ করেছেন; এমনকি রবীন্দ্রনাথকেও ‘রঠা’ বলে আক্রমণ করে বাংলাদেশে হিন্দু আধিপত্যের অভিযোগ তুলেছেন, তাদেরও যদি শেষ পর্যন্ত গোয়েন্দার খাতায় সন্দেহজনক বলে বিবেচনা করা হয়, তাহলে প্রশ্ন একটাই তাহলে বর্তমান রাষ্ট্র হিন্দুদের থেকে আর কী কী ধরনের স্পষ্ট জঙ্গীমানসের সাথে আনুগত্য খুঁজছে আরো আরো! হিন্দুরা লাগাতার খুন হওয়ার পর ‘স্পিকটি নট’ থাকার পরে জামায়াত আচরণে কথা বলার পরেও কিভাবে মেধাতালিকা থেকে বাদ যায়!
আরও মজার বিষয় হলো, এই হিন্দুদের অনেকেই নিজেদের এমন রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করেছেন যেখানে আওয়ামী লীগবিরোধিতা প্রবল, ভারতবিরোধিতা আরও প্রবল এবং পাকিস্তানের প্রতি তুলনামূলকভাবে নরম মনোভাবও প্রকাশ্য। জামায়াতের সুরে সুর মিলিয়ে এভাবে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অবস্থানেও কেউ কেউ এমনভাবে নিজেদের উপস্থাপন করেছেন, যেন ধর্মীয় পরিচয় এক জিনিস আর রাজনৈতিক পরিচয় আরেক জিনিস তাদের এখন! অর্থাৎ তারা নিজেদের মতো করে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে তারা আওয়ামী লীগের নন, তারা ভারতের আধিপত্যের বিরোধী, তারা জুলাইয়ের পক্ষে, তারা কথিত ‘নতুন’ বাংলাদেশের পক্ষে!
তবু যদি শেষ পর্যন্ত তাদের চাকরি আটকে যায়, কিংবা গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তাদের ‘বিশ্বাসযোগ্য নন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে আর কি কি করলে হিন্দুরা এই বিএনপি-জামায়াত পরিচালিত সরকারের বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার সামর্থ্যবান পরিচয় অর্জন করবে?
কেউ আওয়ামী লীগবিরোধী হলেই কি সে নিরাপদ? কেউ ভারতবিরোধী হলেই কি সে দেশপ্রেমিক? কেউ পাকিস্তানের প্রতি নমনীয় হলেই কি তার দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট পাওয়া যায়? নাকি শেষ পর্যন্ত আরও কয়েকটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে? ৩২% থেকে লাগাতার খুন, ধর্ষণ আর দেশত্যাগের পুরস্কারে এখন হিন্দুর সংখ্যা মেরেকেটে ৭%। এবার কথিত ‘নতুন’ বাংলাদেশে হিন্দুদের এখন রাষ্ট্রীয় অনুবাদের খৎনাই কি তাহলে বাকি!
এখানেই ব্যঙ্গাত্মক প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায়, তাহলে কি রাজনৈতিক আনুগত্যের শেষ সিঁড়িতে উঠে তাদের ধর্মীয় পরিচয়ও বদলাতে হবে? কলমা পড়ে আবদুল নাম রাখলেই কি রাষ্ট্রের সন্দেহ কেটে যাবে?
প্রশ্নটি আসলে কোনো ধর্মকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি রাষ্ট্রের বিশ্বাসের রাজনীতি নিয়ে। একজন নাগরিকের রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য কি তার ধর্ম দিয়ে নির্ধারিত হবে? তার ফেসবুক পোস্ট দিয়ে? তার পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে? তার ভারত সম্পর্কে মতামত দিয়ে? তার পাকিস্তান সম্পর্কে অবস্থান দিয়ে? নাকি তার যোগ্যতা, সততা, আইন মেনে চলা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ দিয়ে?
যদি গোয়েন্দা যাচাইয়ের নামে কারও চাকরি আটকে দেওয়া হয়, তাহলে সেই যাচাইয়ের মানদণ্ড কী সেটিও জনগণের জানার অধিকার আছে। কারণ একটি অদৃশ্য প্রতিবেদনের ওপর যদি একজন নাগরিকের চাকরি, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করে, তাহলে সেই প্রতিবেদনের ন্যায্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবেই।
আজ যারা নিজেদের নিরাপত্তা প্রমাণ করতে গিয়ে অন্যের দেশপ্রেম মাপছেন, কাল হয়তো তাদের নিজেদের দেশপ্রেমের মাপজোক শুরু হবে। আজ যে পরিচয়কে নিরাপদ মনে হচ্ছে, কাল সেটিই হয়তো সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
রাষ্ট্র যদি নাগরিককে প্রথমে ‘হিন্দু’, ‘মুসলমান’, ‘আওয়ামী লীগ’, ‘বিএনপি’, ‘জামায়াত’, ‘ভারতপন্থী’, ‘ভারতবিরোধী’, ‘জুলাই যোদ্ধা’ কিংবা ‘বামপন্থী পরিবারের সন্তান’ হিসেবে দেখতে শুরু করে, তাহলে নাগরিক পরিচয়টি কোথায় থাকবে?
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি হলো নাগরিককে তার ধর্মীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক মতের কারণে সন্দেহের চোখে না দেখে আইনের সমান মানদণ্ডে বিচার করা। তাই আজকের আসল প্রশ্ন শুধু কোনো হিন্দু প্রার্থী চাকরি পেলেন কি পেলেন না তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, একজন নাগরিককে রাষ্ট্রের বিশ্বাস অর্জনের জন্য ঠিক কতবার নিজের পরিচয় বদলাতে হবে?
আর যদি উত্তর হয় ধর্ম নয়, রাজনৈতিক আনুগত্য; রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, আবার অন্য কোনো আনুগত্য, তাহলে একদিন হয়তো দেখা যাবে, সবাই রাষ্ট্রের কাছে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে ব্যস্ত, অথচ রাষ্ট্র নিজেই ভুলে গেছে তার নাগরিকদের বিশ্বাস করার অর্থ কী।
সেদিন আর হাসির কোনো কারণ থাকবে না। প্রশ্নটি হবে আরও ভয়ংকর, এই রাষ্ট্রে নাগরিক হওয়ার জন্য আর কী কী প্রমাণপত্র লাগবে হিন্দুদের?
আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


