চীনের দ্রুত সম্প্রসারিত নৌবাহিনী এবং পাকিস্তানের বহরে চীনের তৈরি আধুনিক আক্রমণাত্মক ডুবোজাহাজ যুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে নিজেদের সামুদ্রিক শক্তি আরও বহুগুণ বাড়ানোর পথে হাঁটছে ভারত। আগামী ১০ বছরের মধ্যে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা ২০০-এরও বেশি করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে নয়াদিল্লি। এই পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে ভারত শুধু ভারত মহাসাগরেই নয়, সমগ্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আরও শক্তিশালী সামুদ্রিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবং পাকিস্তানের নৌ-সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকে সামনে রেখেই ভারতের এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চলতি মাসেই ভারতীয় নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে অত্যাধুনিক স্টেলথ ফ্রিগেট আইএনএস মহেন্দ্রগিরি এবং ডুবোজাহাজ শিকারি যুদ্ধজাহাজ আইএনএস মালভান। দুটি যুদ্ধজাহাজই ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তি ও শিল্প সক্ষমতায় নির্মিত, যা প্রতিরক্ষা খাতে বিদেশি নির্ভরতা কমানোর কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আইএনএস মহেন্দ্রগিরি নীলগিরি শ্রেণির ষষ্ঠ যুদ্ধজাহাজ। এর নকশা করেছে ভারতীয় নৌবাহিনীর ওয়ারশিপ ডিজাইন ব্যুরো এবং নির্মাণ করেছে মাজাগন ডক শিপবিল্ডার্স। জাহাজটির প্রায় ৭৫ শতাংশ উপকরণ দেশীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে। একই শ্রেণির সপ্তম যুদ্ধজাহাজ বিন্ধ্যাগিরিও আগামী কয়েক মাসের মধ্যে নৌবহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি প্রজেক্ট-১৭ ব্রাভো-এর আওতায় আরও সাত থেকে আটটি নতুন প্রজন্মের যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে।
বর্তমানে ভারতের নৌবাহিনীতে প্রায় ১৫০টি জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৩৫টি ফ্রিগেট, ডেস্ট্রয়ার ও ডুবোজাহাজের মতো সম্মুখসারির যুদ্ধজাহাজ। এছাড়া আরও প্রায় ৫০টি যুদ্ধজাহাজ বিভিন্ন পর্যায়ে নির্মাণাধীন রয়েছে।
ভারতীয় নৌবাহিনীর সাবেক রিয়ার অ্যাডমিরাল ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক সঞ্জয় মিশ্রের মতে, দেশীয় জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। ফলে ২০৩৫ সালের মধ্যে ২০০ যুদ্ধজাহাজের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব, এমনকি প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে সেই সংখ্যাও অতিক্রম করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, বর্তমান কৌশলগত বাস্তবতায় ভারতকে অন্তত দুটি পূর্ণাঙ্গ, দ্রুত মোতায়েনযোগ্য ও স্বয়ংসম্পূর্ণ নৌবহর প্রস্তুত রাখতে হবে। আর সেই সক্ষমতা অর্জনে আরও বেশি সংখ্যক যুদ্ধজাহাজ ও সহায়ক জাহাজ প্রয়োজন।
ভারতীয় নৌবাহিনী বর্তমানে দ্রুতগতিতে নতুন জাহাজ বহরে যুক্ত করছে। প্রায় প্রতি ছয় সপ্তাহে একটি নতুন যুদ্ধজাহাজ কমিশন করা হচ্ছে। শুধু গত দেড় মাসেই দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত পাঁচটি যুদ্ধজাহাজ নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে।
ভারতের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো ২০৪৭ সালের মধ্যে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ থেকে শুরু করে যন্ত্রাংশ উৎপাদন পর্যন্ত পুরো প্রতিরক্ষা জাহাজ শিল্পে সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল হওয়া।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০০টির বেশি আধুনিক যুদ্ধজাহাজের নৌবহর গড়ে তুলতে পারলে ভারতের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এতে ভারত মহাসাগরে তাদের কৌশলগত প্রভাব আরও শক্তিশালী হবে এবং চীন ও পাকিস্তানের নৌ-চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারত আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্ষম অবস্থানে পৌঁছে যাবে।


