হত্যা, চাঁদাবাজি, অস্ত্র, ডাকাতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের একাধিক মামলার আসামিরা গ্রেপ্তারের পর অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে মুক্তি পাচ্ছেন। আর মুক্তি পেয়েই তাদের অনেকের বিরুদ্ধে আবারও হত্যা, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও সশস্ত্র হামলার মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে খুলনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে খুলনা মহানগরে পুলিশের তালিকাভুক্ত ১৫ জন শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হলেও বর্তমানে সবাই জামিনে মুক্ত। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে তিনটি থেকে ১৪টিরও বেশি হত্যা, অস্ত্র, ডাকাতি, মাদক ও চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে। এর মধ্যে সাতজন উচ্চ আদালত এবং বাকিরা বিচারিক আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন।
জামিনে মুক্তি পাওয়া তালিকাভুক্তদের মধ্যে রয়েছেন আরমান হোসেন মোল্লা, তাওহিদুল ইসলাম তুহিন ওরফে কালা তুহিন, এজাজুল হোসেন, শামীম শেখ ওরফে টুন্ডা শামীম, রাব্বি চৌধুরী, সাকিবুর রহমান জিতু, নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম, হোসেন ঢালী, ইসতিয়াক শাহরিয়ার, কাজী রায়হান ইসলাম, আসিফ মোল্লা, শামীম সরদার ওরফে ঢাকাইয়া শামীম, রনি শেখ ওরফে কাবা, মনিরুল ইসলাম বাবু ওরফে পুরি বাবু এবং কসাই লিটন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আরমান হোসেন মোল্লার নাম সম্প্রতি মসজিদে ঢুকে ব্যবসায়ী লোকমান হাকিমকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় উঠে এসেছে। কালা তুহিনের বিরুদ্ধে বটিয়াঘাটায় যুবক আজিজুল ইসলাম হত্যা মামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। ঢাকাইয়া শামীমের নাম সোনাডাঙ্গায় গুলিবর্ষণ ও এনসিপি নেতা মোতালেব শিকদারকে হত্যাচেষ্টা মামলায় এসেছে। নাসিমুল গণি (নাসিম) ও আরমানের নাম দৌলতপুরে ছাত্রদল নেতা রাশিকুল আনাম রাশু হত্যা মামলার তদন্তে উঠে এসেছে। অন্যদিকে মনিরুল ইসলাম বাবু (পুরি বাবু)-এর বিরুদ্ধে শেখপাড়া এলাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া কসাই লিটন, হোসেন ঢালী, রাব্বি চৌধুরী, টুন্ডা শামীম, ইসতিয়াক শাহরিয়ার ও রনি শেখের নাম মাদক, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাতের বিভিন্ন ঘটনায় এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
খুলনা মহানগর পুলিশের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের পর থেকে মহানগরে ৯১টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৩৪টির সঙ্গে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তার হওয়া বহু আসামিই ইতোমধ্যে জামিনে মুক্ত হয়ে এলাকায় পুনরায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, আসামিরা জামিনে বের হয়ে মামলা তুলে নিতে চাপ দিচ্ছে, সাক্ষীদের হুমকি দিচ্ছে এবং নতুন করে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে অনেক পরিবারই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও শঙ্কায় রয়েছে।
খুলনা পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেছেন, নগরীর ১৮১ জন সন্ত্রাসীর তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেককে গ্রেপ্তার করা হলেও দুর্ধর্ষ অপরাধীরা কয়েক মাসের মধ্যেই জামিনে মুক্তি পাচ্ছেন। বিষয়টি আদালতকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
এদিকে, খুলনা বিভাগীয় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায়ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, অধিকাংশ মামলাই জামিন অযোগ্য ধারায় হলেও অভিযুক্তরা দ্রুত জামিন পাওয়ায় পুলিশের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অপরাধ দমনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর খুলনা জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, জামিন পাওয়া একজন আসামির আইনগত অধিকার হলেও, যাদের মুক্তি জননিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে, তাদের ক্ষেত্রে আদালতের আরও সতর্কতার সঙ্গে বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
খুলনায় একের পর এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর জামিনে মুক্তি এবং তাদের বিরুদ্ধে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ নতুন করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, শুধু গ্রেপ্তার নয়, দাগী অপরাধীদের বিচারের আওতায় এনে কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে সন্ত্রাসের এই চক্র ভাঙা কঠিন হবে।


