১৬টি স্থানে একযোগে তল্লাশি, উদ্ধার মোবাইল-সহ বিপুল ডিজিটাল ডিভাইস; তরুণদের উগ্রপন্থায় প্রভাবিত করার অভিযোগ
পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাত-উল-মুজাহিদিন বাংলাদেশ (JMB)-এর একটি শাখার নেটওয়ার্ক বিস্তারের অভিযোগ ঘিরে বড়সড় অভিযান চালিয়েছে ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (NIA)। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও কেরলের মোট ১৬টি স্থানে একযোগে তল্লাশি চালিয়ে ১৩ জন জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাটি। NIA জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে অসমের ৮ জন, পশ্চিমবঙ্গের ৪ জন এবং কেরলের ১ জন রয়েছেন।
অভিযানের সময় অভিযুক্তদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, পেনড্রাইভ, মেমোরি কার্ডসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ডিভাইসের মাধ্যমে সংগঠনের যোগাযোগ, অনলাইন কার্যক্রম এবং কথোপকথন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।
NIA-এর অভিযোগ, ইমাম মাহমুদের কাফিলা (IMK) নামে পরিচিত একটি সংগঠনকে কেন্দ্র করে ভারতে গোপন সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা চলছিল। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, সংগঠনটি নিষিদ্ধ JMB-এর একটি শাখা হিসেবে কাজ করছিল এবং পশ্চিমবঙ্গসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন এলাকায় উগ্রপন্থী মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছিল।
তদন্তকারীদের অভিযোগ, তরুণদের অনলাইনে উগ্রপন্থী মতাদর্শে প্রভাবিত করা, সংগঠনের সাংগঠনিক ভিত্তি বিস্তৃত করা এবং গোপনে সদস্য সংগ্রহের মতো কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা ছিল। এ কাজে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল বলেও দাবি করেছে NIA।
মামলাটির সূত্রপাত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে। অসম পুলিশ সে সময় অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১১ জন জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে। পরে ৩০ ডিসেম্বর অসম পুলিশের STF থানায় মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলায় মোট ৩৫ জন জঙ্গির নাম উঠে আসে।
তদন্তকারীদের দাবি, বাংলাদেশে অবস্থানকারী IMK-র কথিত হ্যান্ডলাররা ‘Purva Akash’ নামে একটি টেলিগ্রাম গ্রুপ ব্যবহার করে অনলাইন র্যাডিক্যালাইজেশনের কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন। ওই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তরুণদের উগ্রপন্থী মতাদর্শে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
প্রাথমিক তদন্ত শেষে ২০২৬ সালের ২৫ জুন ১১ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়। পরবর্তী সময়ে মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে NIA। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাটি গুয়াহাটির বিশেষ NIA আদালতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS), ২০২৩ এবং বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন (UAPA)-এর বিভিন্ন ধারায় চার্জশিট দাখিল করে।
NIA-এর তদন্তে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, JMB-র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইমাম মাহমুদ হাবিবুল্লাহ ভারতে সংগঠনটির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে IMK গঠন করেছিলেন। এরপর ওই সংগঠনের মাধ্যমে JMB-র মতাদর্শ ও সাংগঠনিক উপস্থিতি বিস্তারের চেষ্টা করা হয় বলে তদন্তকারীদের দাবি।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গোপন বৈঠক আয়োজন, ধর্মীয় মতাদর্শের আড়ালে মতাদর্শগত প্রভাব বিস্তার, উগ্রপন্থী সাহিত্য প্রচার এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রচারণা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি IMK/JMB নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য তৈরির চেষ্টাও করা হচ্ছিল বলে NIA জানিয়েছে। মঙ্গলবারের ১৬টি স্থানে তল্লাশি ও ১৩ জন জঙ্গিকে গ্রেপ্তারের অভিযানকে সেই তদন্তেরই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে NIA।
এখন উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোন, পেনড্রাইভ, মেমোরি কার্ডসহ অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা করা হবে। এসব ডিভাইস থেকে কথিত নেটওয়ার্কের সদস্যদের যোগাযোগ, অনলাইন কার্যক্রম, সাংগঠনিক নির্দেশনা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট তথ্য বেরিয়ে আসে কি না, সেটিই তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

