আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম
আধুনিক বিশ্বরাজনীতির অভিধানে ‘মাল্টি এলাইনমেন্ট’ এমন এক কূটনৈতিক বাস্তবতা, যেখানে কোনো রাষ্ট্র নিজেকে একটি নির্দিষ্ট শক্তিবলয়ের সঙ্গে স্থায়ীভাবে আবদ্ধ না করে একইসঙ্গে একাধিক পরাশক্তি ও ভূরাজনৈতিক মেরুর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে। লক্ষ্য একটাই, জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে যত বেশি সম্ভব কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিসর নিজের জন্য খোলা রাখা। আজকের বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় ভারতের পররাষ্ট্রনীতি এই বাস্তবতার একটি বহুল আলোচিত উদাহরণ। ওয়াশিংটনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব, মস্কোর সঙ্গে ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে বিপুল বাণিজ্য, জাপানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ, সবকিছু একই সময়ে পরিচালনা করার সক্ষমতাই আধুনিক মাল্টি এলাইনমেন্টের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
এই জায়গাতেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে নতুন করে দেখা যায়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন অবশ্য শেখ হাসিনার সময় থেকে শুরু হয়নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উচ্চারিত ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ স্বাধীন বাংলাদেশের কূটনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে এই নীতিই একটি নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়। ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ একাধিক শক্তির সঙ্গে একই সময়ে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য।
চীনের সঙ্গে অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ক যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ, বাণিজ্য ও ট্রানজিট সহযোগিতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। জাপানের সঙ্গে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সহযোগিতা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে থেকেছে। অর্থাৎ ঢাকার কূটনীতির সামনে তখন একটি কঠিন সমীকরণ ছিল, কাউকে বাদ দিয়ে অন্য কারও দিকে সম্পূর্ণ ঝুঁকে যাওয়া নয়; বরং প্রত্যেক সম্পর্ককে বাংলাদেশের প্রয়োজন ও স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালনা করা। এটাই মাল্টি এলাইনমেন্টের মূল যুক্তি।
কূটনীতির এই সমীকরণ সহজ নয়। কারণ পরাশক্তিগুলো নিজেরাও একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। ভারত ও চীনের সীমান্তবিরোধ আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তীব্র কৌশলগত প্রতিযোগিতা রয়েছে। রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক ইউক্রেন যুদ্ধের পর আরও সংঘাতপূর্ণ হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, অবকাঠামো, জ্বালানি ও নিরাপত্তার প্রয়োজন, এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই এসব শক্তির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পর্ক প্রয়োজন। এই বাস্তবতায় একটি ছোট রাষ্ট্রের জন্য কূটনীতির সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে ওঠে ভারসাম্য।
শেখ হাসিনার সময়ে বাংলাদেশ সেই ভারসাম্য কতটা সফলভাবে ধরে রাখতে পেরেছিল, এ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু এটুকু অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে তাঁর সরকারের সময়ে ঢাকা একইসঙ্গে দিল্লি, বেইজিং, মস্কো, টোকিও এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। কোয়াড নিয়েও বাংলাদেশের অবস্থান ছিল সতর্ক। বাংলাদেশ কোয়াডের সদস্য হয়নি। একইভাবে BRICS এর পূর্ণ সদস্যও হয়নি। তবে BRICS কে কেবল চীন রাশিয়ার জোট হিসেবে দেখা সঠিক নয়; ভারতও এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ BRICS সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়েছিল এবং শেখ হাসিনা সেখানে অংশ নেন। এই অবস্থানকে কেউ কৌশলগত ভারসাম্য হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারেন, কেউ আবার বাংলাদেশের জন্য আরও সক্রিয় বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততার প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে পারেন। কিন্তু ঘটনাগুলো দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট, বাংলাদেশ কোনো একক শক্তির সঙ্গে নিজের সমস্ত কূটনৈতিক ভবিষ্যৎকে বেঁধে দেয়নি।
আর এখানেই শেখ হাসিনার পররাষ্ট্রনীতিকে বোঝার জন্য ‘মাল্টি এলাইনমেন্ট’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ রাষ্ট্রের আয়তন ছোট হলেই তার কূটনৈতিক পরিসর ছোট হতে হবে, আধুনিক বিশ্বরাজনীতি এমন কথা বলে না। বরং বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী বাংলাদেশ তার ভূগোলকে ব্যবহার করেছে সংযোগের সম্পদ হিসেবে। ভারত চেয়েছে উত্তর পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ও ট্রানজিট সুবিধা। চীন চেয়েছে অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক সংযোগ। জাপান চেয়েছে বৃহৎ অবকাঠামো সহযোগিতা। রাশিয়া দিয়েছে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রযুক্তি ও অর্থায়ন। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও অন্যান্য পণ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার।
অর্থাৎ বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ছিল একাধিক দরজা খোলা রাখার। সেই দরজাগুলো কতটা সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, কোন প্রকল্পে কী লাভ হয়েছে, কোথায় ভুল হয়েছে, এসব নিয়ে ইতিহাস ও অর্থনীতির নিজস্ব বিচার থাকবে। কিন্তু কূটনৈতিক দর্শনের জায়গা থেকে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেস স্টাডি। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, ‘বন্ধুত্ব’ আর ‘নির্ভরতা’ এক জিনিস নয়। কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা মানেই তার কৌশলগত বলয়ে প্রবেশ করা নয়। আবার কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য থাকা মানেই তার রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করা নয়। আধুনিক কূটনীতির সবচেয়ে বড় দক্ষতা সম্ভবত এখানেই, সম্পর্ক রাখা কিন্তু সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা ধরে রাখা।
বঙ্গবন্ধুর ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতিটি তাই একবিংশ শতাব্দীর বহুমেরুর পৃথিবীতে নতুন অর্থ পেয়েছে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়কে যে দৃষ্টিকোণ থেকেই মূল্যায়ন করা হোক না কেন, বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কের এই বহুমাত্রিক চরিত্রটি আলোচনার দাবি রাখে। দেশীয় রাজনীতির তীব্র বিতর্কের বাইরে দাঁড়িয়ে যদি শুধু গ্লোবাল পাওয়ার ডায়নামিক্সের লেন্সে তাকানো যায়, তাহলে দেখা যায়, বাংলাদেশকে ঘিরে ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের স্বার্থ একই ভূগোলে এসে মিলেছে।
এই ভূগোল বাংলাদেশের জন্য যেমন আশীর্বাদ, তেমনি চ্যালেঞ্জও। কারণ ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সামরিক ক্ষমতা নয়; অনেক সময় তার সবচেয়ে বড় শক্তি হয় কাউকে পুরোপুরি হারিয়ে না দিয়ে সবাইকে নিজের সঙ্গে কাজ করার মতো পর্যাপ্ত জায়গা করে দেওয়া। শেখ হাসিনার সময়কার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে তাই কেবল ‘কার বন্ধু, কার শত্রু’ এই সরল দ্বিমেরু প্রশ্নে বিচার করলে পুরো ছবিটা ধরা পড়ে না। বরং দেখতে হবে, ঢাকা কতটা নিজের স্বার্থে একাধিক শক্তির সঙ্গে একই সময়ে দরকষাকষি করতে পেরেছে, কতটা অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পেরেছে এবং কতটা কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখতে পেরেছে।
আজকের পৃথিবী আর এককেন্দ্রিক নয়। ওয়াশিংটন, বেইজিং, মস্কো, নয়াদিল্লি, টোকিও, প্রত্যেকের নিজস্ব শক্তি, স্বার্থ ও প্রভাববলয় আছে। এই বহুমেরুর পৃথিবীতে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো এক মেরুর ছায়ায় দাঁড়ানো, নাকি একাধিক মেরুর সঙ্গে নিজের স্বার্থে সম্পর্ক পরিচালনা করা? বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতির ঐতিহ্য দ্বিতীয় পথটির কথাই বলে।
আর সেই পথের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাক্যটি আজও একই, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ বঙ্গবন্ধু যে নীতির বীজ বপন করেছিলেন, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে সেটিই এক ভিন্ন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন মাত্রা পেয়েছিল। সেই অধ্যায়ের মূল্যায়ন ইতিহাস করবে। কিন্তু বহুমেরুর বিশ্বে ছোট রাষ্ট্র কীভাবে বড় শক্তিগুলোর মাঝখানে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করতে পারে, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা সেই আলোচনায় অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও ভু-রাজনৈতিক বিশ্লেষক


