৯৩ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম চুরি, অচল সিগন্যাল ব্যবস্থা- বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি
প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ঢাকা-ভাঙ্গা-যশোর পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি চুরির ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত কয়েক মাসে রেললাইন, সিগন্যাল, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, স্টেশন ও বিভিন্ন অবকাঠামো থেকে ৯৩ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ চুরি হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
২৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথটি প্রায় ৩৮ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত। প্রকল্পটির বিপুল ব্যয়ের কারণে এটিকে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। কিন্তু এত বড় বিনিয়োগের অবকাঠামো চালু হওয়ার পরও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও জনবল না থাকায় বিভিন্ন স্থাপনা ও যন্ত্রাংশ চুরির অভিযোগ উঠেছে।
চুরি যাওয়া সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে ফিশ বোল্ট, ইলাস্টিক রেল ক্লিপ, ফিশ প্লেট, গেজ প্লেট, টার্ন-আউট বোল্ট, বাফারের বিভিন্ন অংশসহ রেললাইনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ। পাশাপাশি সেতু, কালভার্ট, আন্ডারপাস ও ভায়াডাক্ট থেকেও বিভিন্ন ধাতব সামগ্রী চুরি হয়েছে। স্টেশন ও ভবন থেকে পাম্পের মোটর, পানির মিটার, দরজার লকিং সিস্টেম, গ্রিল, ম্যানহোল কভার, স্যানিটারি ফিটিংস ও ফ্যানও গায়েব হওয়ার তথ্য রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, চুরির তালিকায় রয়েছে সিগন্যাল ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম। ট্র্যাক পট, ট্র্যাক ট্রান্সফরমার, অ্যাক্সেল কাউন্টার, পয়েন্ট মেশিন ও পয়েন্ট মোটরের মতো যন্ত্রাংশ চুরি হওয়ায় কয়েকটি এলাকায় আধুনিক কম্পিউটারভিত্তিক সিগন্যাল ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে কোথাও কোথাও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে, যা রেল নিরাপত্তায় বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।
মাদারীপুরের শিবচর অংশে একাধিকবার ট্র্যাক পট চুরির ঘটনাও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চুরি হলে সংশ্লিষ্ট ব্লক ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে এবং ট্রেন পরিচালনায় জটিলতা সৃষ্টি হয়। নিরাপদে ট্রেন চালাতে কর্মীদের ঝুঁকি নিয়ে রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে ম্যানুয়ালি দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
এদিকে পুরো প্রকল্প করিডরে চুরি ও নাশকতার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। তাদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ রেলওয়েকে দেওয়া চিঠিতে পর্যাপ্ত জনবল ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে। চুরি ঠেকাতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের রেল দুর্ঘটনার আশঙ্কার কথাও সতর্ক করা হয়েছে।
শুধু নিরাপত্তা নয়, প্রকল্পটিতে রয়েছে জনবল সংকটও। প্রস্তাবিত ১ হাজার ৫৭৪ জন নতুন জনবল নিয়োগের অনুমোদন এখনো আটকে রয়েছে। পর্যাপ্ত জনবল ও নিরাপত্তার অভাবে অনেক স্টেশনও পুরোপুরি কার্যকর করা যাচ্ছে না।
প্রকল্পটির পুরো রুট দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪৮টি যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন চালানোর সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে নিয়মিত চলছে মাত্র ছয়টি ট্রেন। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোর পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিপুল অর্থের এই মেগা প্রকল্পে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি চুরি শুধু আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়- এটি সরাসরি রেল চলাচলের নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। তাই চুরি প্রতিরোধ, অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং দায়ীদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।


