আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম
একটি রাষ্ট্রকে জয় করতে সবসময় সেনাবাহিনী লাগে না। ইতিহাসের পাতায় সাম্রাজ্যবাদ বহুবার নিজের রূপ বদলেছে। একসময় যুদ্ধজাহাজ আসত, কামান গর্জে উঠত, পতাকা নামিয়ে নতুন পতাকা ওড়ানো হতো। আজ আর সেসবের প্রয়োজন হয় না। এখন একটি রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করার পথ তৈরি হয় চুক্তিপত্রে, বিনিয়োগে, ঋণে, প্রযুক্তিতে, জ্বালানিতে, তথ্যভান্ডারে এবং কৌশলগত অবকাঠামোয়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘটনাগুলো একসঙ্গে সাজিয়ে দেখলে অনেকের মনেই তাই প্রশ্ন জাগে- আমরা কেন ধীরে ধীরে এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছি, যেখানে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো ক্রমশ যুক্তরাষ্ট্রের দিকে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে?
দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল। সেই টার্মিনাল পরিচালনায় আগ্রহ দেখিয়েছে একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান। বিমানবন্দর শুধু যাত্রী ওঠানামার জায়গা নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সংযোগের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। এটা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে করায়ত্ত্বে যাওয়া সবচেয়ে বড় সার্বভৌমত্ব কৌশল হারানো।।
এরপর আসে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। মুক্তিযোদ্ধাদের জাতীয় ডেটাবেইজ তৈরিতে সহযোগিতা করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। মুক্তিযুদ্ধ এই জাতির আত্মপরিচয়, আত্মত্যাগ ও রাষ্ট্রচেতনার ভিত্তি। সেই ইতিহাসের ডিজিটাল অবকাঠামোতেও যখন বিদেশি সহযোগিতা অপরিহার্য হয়ে ওঠে, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে কেন আমরা কি ধীরে ধীরে নিজেদের সক্ষমতা হারাচ্ছি?
বিএনপি সরকার দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা করছে। অর্থাৎ রান্নাঘরের চুলা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার চাকা সবকিছুর জ্বালানি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যুক্ত হবে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহের সঙ্গে। কিছুদিন আগে দেখা গেলো বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে তেল কিনতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অনুমতি’ চাচ্ছে! কি ভয়ানক ব্যাপার! একটা স্বাধীন রাষ্ট্র তাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে আরেকটা রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে!!
২ লাখ ২০ হাজার টন গম কেনা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। প্রতি টনের দাম ৩২২ ডলার। মোট ব্যয় প্রায় ৮৭০ কোটি টাকা। অথচ, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বেশি দামে এই গম কেনা হয়েছে। অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করবে দেশের সাধারণ মানুষ। আর, প্রভু যুক্তরাষ্ট্রের পায়ের কাছে শিকলবন্দী বাংলাদেশ!
একটি বিমানবন্দর, একটি জাতীয় ডেটাবেইজ, একটি জ্বালানি খাত, একটি খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, চারটি ঘটনাই যদি আলাদা করে দেখা হয়, তাহলে হয়তো এগুলোকে স্বাভাবিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মনে হতে পারে। কিন্তু একই সময়ে যখন একই রাষ্ট্রের উপস্থিতি একের পর এক কৌশলগত খাতে দৃশ্যমান হতে থাকে, তখন পরিস্কার হয়ে ওঠে, এটি কিছুতেই কাকতালীয় নয়, বরং একটা রাষ্ট্রের কাছে গোলামীর দালিলিক আখ্যান।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একটি কথা আছে, নির্ভরতা কখনো একদিনে তৈরি হয় না; এটি ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হয়। যে রাষ্ট্র নিজের খাদ্যের জন্য অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকে, জ্বালানির জন্য অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকে, প্রযুক্তির জন্য অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকে, কৌশলগত অবকাঠামোর ব্যবস্থাপনার জন্য অন্যের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে থাকে, সেই রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্ব কতটা অটুট থাকে, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
উন্নয়ন আর নির্ভরতার মাঝখানে একটি সূক্ষ্ম সীমারেখা আছে। বন্ধুত্ব প্রয়োজন, কিন্তু বন্ধুত্ব যেন আত্মনির্ভরতাকে গ্রাস না করে। সহযোগিতা প্রয়োজন, কিন্তু সহযোগিতা যেন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে সংকুচিত না করে। বিনিয়োগ প্রয়োজন, কিন্তু বিনিয়োগ যেন জাতীয় স্বার্থের বিনিময়ে না হয়।
একটি দেশের সার্বভৌমত্ব শুধু সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদে লেখা থাকে না। সার্বভৌমত্ব টিকে থাকে তখনই, যখন একটি রাষ্ট্র নিজের খাদ্য, জ্বালানি, তথ্য, অবকাঠামো ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে।
আজ বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই কোনো একটি চুক্তি নয়, কোনো একটি প্রকল্পও নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি আত্মনির্ভরতার পথকে শক্তিশালী করছি, নাকি ধীরে ধীরে এমন এক নির্ভরতার জালে জড়িয়ে পড়ছি, যার সুতো একদিন আমাদের সিদ্ধান্তের স্বাধীনতাকেও বেঁধে ফেলতে পারে?
ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট। একটি রাষ্ট্রের পতাকা নামানোর আগে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে দুর্বল করা হয়। আর তাই উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতিটি পদক্ষেপে জাতীয় স্বার্থ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য দায়িত্ব। সর্বশেষে নোয়াম চমস্কির সেই বিখ্যাত উক্তি দিয়ে শেষ করি, “যুক্তরাষ্ট্র যার বন্ধু, তার শত্রুর প্রয়োজন হয়না”।
বাংলাদেশ বাংলাদেশে ফিরুক।।
আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


