বিশ্বকাপ ফাইনালের মহারণে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্বের দুই পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও স্পেন। শিরোপা নির্ধারণী এই লড়াইয়ের আগে প্রতিপক্ষের সবচেয়ে বড় তারকা লিওনেল মেসির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন স্পেনের প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তবে তাঁর বক্তব্যে শুধু মেসির প্রতি শ্রদ্ধাই নয়, বরং আর্জেন্টিনার সফলতার পথ অনুসরণ করারও স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে।
দে লা ফুয়েন্তে বলেছেন, “মেসি এখনও ১৯ বা ২৩ বছর বয়সী একজন তরুণের মতোই খেলেন। তাঁর ক্ষুধা, উদ্যম এবং জয়ের আকাঙ্ক্ষা একটুও কমেনি।” স্পেন কোচের এই মন্তব্য কেবল প্রশংসা নয়, বরং নিজের দলকে কীভাবে সাজাতে চান, তারও প্রতিফলন।
কাকতালীয়ভাবে স্পেন দলে আছেন ১৯ বছর বয়সী বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামাল এবং ২৩ বছর বয়সী তরুণ সেন্টার-ব্যাক পাউ কুবারসি। এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে তরুণ স্কোয়াডগুলোর একটি নিয়ে খেলছে স্পেন। দলটির গড় বয়স মাত্র ২৬.১ বছর, যেখানে আর্জেন্টিনার গড় বয়স ২৮.৫ বছর। অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের এই দ্বৈরথে স্পেন বিশ্বাস করছে তাদের তরুণ শক্তিই হতে পারে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
বিশ্বকাপজুড়ে লামিনে ইয়ামাল, পাউ কুবারসি, পেদ্রো পোরো, দানি ওলমো ও রদ্রিদের পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছে বয়স নয়, আত্মবিশ্বাস ও পরিণতিই বড় বিষয়। ফ্রান্স, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছেছে তারা। বিশেষ করে ইয়ামাল বারবার বলেছেন, তিনি কোনো চাপ অনুভব করেন না; কেবল ফুটবল উপভোগ করেন। সেই নির্ভার মানসিকতাই স্পেনের বড় শক্তি হয়ে উঠেছে।
দে লা ফুয়েন্তে মেসির আরেকটি গুণের কথাও তুলে ধরেছেন-অদম্য ক্ষুধা এবং ক্লান্তিহীন মানসিকতা। পুরো টুর্নামেন্টে স্পেনও একই ধাঁচের ফুটবল খেলেছে। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে মার্ক কুকুরেয়া, পেদ্রো পোরো ও রদ্রি প্রত্যেকে ১২ কিলোমিটারের বেশি দৌড়ে দলের জন্য সর্বোচ্চ পরিশ্রম করেছেন। জয় কিংবা ড্র- কোনো ফলেই আবেগে ভেসে না গিয়ে প্রতিটি ম্যাচে একই মনোযোগ ধরে রেখেছে ‘লা রোজা’।
তবে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছেন আর্জেন্টিনার হার না মানা মানসিকতায়। শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ ১৩ মিনিটে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন করে জয় তুলে নেয় মেসির দল। পুরো নকআউট পর্বেই আর্জেন্টিনা একাধিকবার প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে ফিরে এসে জয়ের ইতিহাস গড়েছে। স্পেন কোচ চান তাঁর দলও শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাক।
ফাইনালকে আরও বিশেষ করে তুলেছে দুই কোচের সম্পর্ক। ফুটবল মহলে পরিচিত তথ্য অনুযায়ী, আর্জেন্টিনার বর্তমান কোচ একসময় লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে কাজ করেছেন এবং তাঁর কাছ থেকেই আধুনিক ফুটবলের নানা কৌশল ও দর্শন শিখেছেন। অর্থাৎ, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এবার মুখোমুখি হচ্ছেন গুরু ও শিষ্য। একদিকে গুরুর অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে শিষ্যের বাস্তব প্রয়োগ-এই দ্বৈরথ ম্যাচটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
ফলে বিশ্বকাপ ফাইনাল শুধু মেসি বনাম স্পেন নয়; এটি তারুণ্য বনাম অভিজ্ঞতা, গুরুর কৌশল বনাম শিষ্যের বাস্তবায়ন এবং দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের লড়াইও। এখন দেখার বিষয়, মেসিদের পথ অনুসরণ করে স্পেন কি ইতিহাস গড়তে পারে, নাকি অভিজ্ঞতা ও অদম্য মানসিকতার জোরে আবারও বিশ্বসেরা হয় আর্জেন্টিনা।


