ঢাকার অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়ায় উদ্বেগজনকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে মাদক কারবার। লাখো শ্রমজীবী মানুষের বসবাস ও কর্মচাঞ্চল্যে মুখর এই এলাকায় ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা ও চোলাই মদের মতো মাদকদ্রব্যের একের পর এক চালান আটকের ঘটনায় এর বিস্তারের চিত্র সামনে আসছে। মাদকের পাশাপাশি চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও কিশোর গ্যাং-সংক্রান্ত অপরাধ নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ।
সর্বশেষ রোববার সাভারের পুড়াবাড়ী পশ্চিমপাড়া এবং আশুলিয়ার বাইপাইল, ডেন্ডাবর ও ইউনিক বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজাসহ নয়জনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশ ও আশুলিয়া থানা পুলিশ। অভিযানে ২০৮ পিস ইয়াবা, ১১৭ পুরিয়া হেরোইন ও ৭৫ গ্রাম গাঁজা জব্দ করা হয়।
এর আগে গত জুনে আশুলিয়ায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে ৩ হাজার ৮০০ পিস ইয়াবা ও ১০০ গ্রাম হেরোইনসহ চারজন গ্রেপ্তার হয়। ওই অভিযানে মাদক কারবারিদের নতুন কৌশলেরও তথ্য পাওয়া যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধি নজরদারিতে রাখতে গলির মুখ ও আশপাশে গোপন সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর অভিযোগ ওঠে।
জুলাইয়ে সাভার ও আশুলিয়ায় পৃথক অভিযানে এক হাজার লিটার চোলাই মদ ও ১০০ পিস ইয়াবাসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সময়ে আশুলিয়ার নিরিবিলি বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে একটি বিলাসবহুল প্রাইভেটকারে রাখা ৪২ কেজি গাঁজা জব্দ করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মাদক পরিবহনে এখন ব্যক্তিগত গাড়িসহ বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করছে কারবারিরা। কোথাও আবার সরাসরি হাতে হাতে মাদক না দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে রেখে মোবাইল ফোনে ক্রেতাকে অবস্থান জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সন্দেহ এড়াতে নারী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকেও মাদক পরিবহনে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে।
আশুলিয়ার জামগড়া, পলাশবাড়ি, মধ্য গাজিরচট, নিরিবিলি, বেড়িবাঁধসহ বিভিন্ন এলাকা এবং সাভারের রাজফুলবাড়িয়া, নামাবাজার, বলিয়ারপুর ও কাঞ্চনপুর বেদেপল্লীসহ কয়েকটি এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন গলি, অস্থায়ী দোকান, চায়ের স্টল ও ভাসমান ব্যবসার আড়ালেও মাদক বিক্রির ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, মাদকের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পাঞ্চলে অন্যান্য অপরাধও বাড়ছে। পুলিশের বিভিন্ন মামলার তথ্যেও দেখা যায়, কিছু ছিনতাইকারী ও ডাকাতের বিরুদ্ধে মাদক-সংক্রান্ত মামলার অভিযোগ রয়েছে। মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে কেউ কেউ চুরি, ছিনতাই বা ডাকাতিতে জড়িয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে বিরোধ, সংঘাত ও সন্ত্রাসের ঘটনাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
বারবার অভিযান ও বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের পরও যদি একই এলাকায় নতুন করে মাদকের চালান ধরা পড়ে, তাহলে প্রশ্ন উঠছে- মাদকের মূল উৎস ও সিন্ডিকেটের হোতারা কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে?
শুধু খুচরা বিক্রেতা কিংবা বহনকারীদের গ্রেপ্তার করে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মাদকের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা, অর্থের জোগান, মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর এবং এর পেছনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া কিংবা প্রশাসনের কোনো পর্যায়ের গাফিলতি আছে কি না- সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।
সাভার-আশুলিয়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু নিয়মিত অভিযান যথেষ্ট নয়। মাদক সিন্ডিকেটের অর্থের উৎস, সরবরাহ নেটওয়ার্ক ও পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিক ও তরুণদের মধ্যে মাদকবিরোধী সচেতনতা, পরিবারভিত্তিক নজরদারি এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আশুলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, মাদক, সন্ত্রাস ও অন্যান্য অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং মাদকমুক্ত আশুলিয়া গড়তে অভিযান অব্যাহত থাকবে।


