ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ। কোথাও পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর আইইডি, কোথাও ‘প্রেশার কুকার বোমা’, আবার কোথাও পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে বিস্ফোরণ। এসব ঘটনায় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এলেও ১০টি মামলার মধ্যে ছয়টির তদন্তে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের দাবি, উদ্ধার হওয়া এসব বিস্ফোরক ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) কিংবা বোমাসদৃশ ডিভাইস। কয়েকটি ঘটনায় নিষিদ্ধ উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার তথ্যও পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
কিন্তু এতসব সতর্কবার্তা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের পরও অধিকাংশ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে- একটির পর একটি বোমা উদ্ধারের পরও কেন অপরাধীদের নাগাল পাচ্ছে না প্রশাসন? কারা এসব বিস্ফোরক বহন করছে, কোথায় তৈরি হচ্ছে এবং কী উদ্দেশ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তা রাখা হচ্ছে- এসব প্রশ্নের উত্তর কি আদৌ বের করতে পারছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী?
গত ২৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার একটি ভাড়া বাড়িতে বিস্ফোরণের পর প্রায় ৪০০ লিটার রাসায়নিক ও নয়টি বোমা উদ্ধারের ঘটনা সামনে আসে। এরপর গত আট মাসে দেশের আরও অন্তত নয়টি স্থানে বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার বা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
এর মধ্যে মতিঝিল, আশুলিয়া, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, যশোর ও সাভারের কয়েকটি ঘটনায় এখনো তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। এসব মামলায় সন্দেহভাজনদের শনাক্ত কিংবা গ্রেপ্তার করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
গত ২১ ফেব্রুয়ারি যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী পকেট গেটে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে হামলার ঘটনা ঘটে। দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে কনস্টেবল মো. শাহ আলম আহত হন। পালানোর সময় তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। পরে ফেলে যাওয়া একটি ব্যাগ থেকে হাতবোমা উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের সঙ্গে উগ্রপন্থিদের সংশ্লিষ্টতার ধারণা পাওয়া গেছে। নব্য জেএমবির নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’ এবং সাভার থেকে গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানের সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত ২৫ মার্চ সায়েদাবাদের জনপথ মোড়ে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে বিস্ফোরণের ঘটনায়ও একই চিত্র। এজাহার অনুযায়ী, একজন সন্দেহভাজন মেরুন রঙের ব্যাগ ফেলে পালিয়ে যায়। পরে আরেক ব্যক্তি ওই ব্যাগ থেকে পাইপবোমাসদৃশ বস্তু বের করে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়।
পরে ব্যাগ থেকে দুটি বোমা উদ্ধার করে নিষ্ক্রিয় করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে পলাতক দুই ব্যক্তিসহ আরও চারজনকে দেখা যায়। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে ব্যাগ ছিল। তদন্তকারীদের ধারণা, তারা একই দলের সদস্য।
গত ২৪ জুলাই মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকে পাইপবোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়। সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল সেটিকে আইইডি হিসেবে শনাক্ত করে।
গত ৩০ জুলাই আশুলিয়ার একটি মুদি দোকান থেকে ‘প্রেশার কুকার বোমা’ উদ্ধার করা হয়। অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা হলেও এখন পর্যন্ত ঘটনায় জড়িত কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। মামলাটি বর্তমানে অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) তদন্ত করছে।
গত ১২ আগস্ট সাভারের সাদাপুরের একটি মসজিদের মাঠ থেকে কালো স্কচটেপে মোড়ানো ‘প্রেশার কুকার বোমা’ উদ্ধার করা হয়। পরে সেটি নিষ্ক্রিয় করা হয়।
গত ৩১ জানুয়ারি যশোরের বাঘারপাড়ায় চুন্নু মোল্লার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ১০টি গ্রেনেড, তিনটি বিদেশি পিস্তল ও ১৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে যৌথ বাহিনী। এসব অস্ত্র মজুতের সঙ্গে তার ছেলে রায়হান মোল্লার সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেলেও অভিযানের আগেই তিনি পালিয়ে যান।
ঘটনার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। উগ্রবাদী সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করে মামলাটি পরে এটিইউতে স্থানান্তর করা হয়।
অন্যদিকে, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরণের ঘটনায় পরিচালক শেখ আল আমিনসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কুমিল্লার মন্দির এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায়ও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ ছাড়া সাভারে নব্য জেএমবির সদস্য সন্দেহে মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানকে গ্রেপ্তারের সময় বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম ও নিষ্ক্রিয় পাইপবোমার ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। সর্বশেষ ১৬ আগস্ট রাজধানীর ডেমরায় দুটি ‘ডেটো বোমা’সহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে এটিইউ। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে।
অর্থাৎ কিছু ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলেও বোমা উদ্ধারের বড় একটি অংশের ঘটনায় তদন্ত এখনো কার্যত অন্ধকারে।
একটির পর একটি বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা কঠিন। কারণ কয়েকটি ঘটনায় একই ধরনের কৌশল, ব্যাগ ব্যবহার, বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম মজুত এবং উগ্রবাদী মতাদর্শের সংশ্লিষ্টতার তথ্য সামনে এসেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা নজরদারির বাইরে কীভাবে এসব বিস্ফোরক প্রস্তুত ও পরিবহন হচ্ছে? গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, পুলিশি তল্লাশি চৌকি, মেট্রোরেল স্টেশন কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মতো জায়গায় বিস্ফোরক পৌঁছে যাওয়ার পরও যদি জড়িতদের শনাক্ত করা না যায়, তাহলে নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা কোথায়- সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
এটিইউর মিডিয়া অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস উইংয়ের পুলিশ সুপার মাহফুজুল আলম রাসেল জানিয়েছেন, তাদের তদন্তাধীন প্রতিটি মামলার তদন্ত চলছে এবং জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে শুধু ‘তদন্ত চলছে’- এই বক্তব্য দিয়ে জনমনের উদ্বেগ কাটানো কঠিন। কারণ একদিকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা উদ্ধার হচ্ছে, অন্যদিকে একাধিক মামলায় মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্তদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না।
প্রশাসনের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- বোমা উদ্ধারের পর শুধু তা নিষ্ক্রিয় করাই কি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার শেষ ধাপ, নাকি এর উৎস, অর্থদাতা, প্রস্তুতকারক, বহনকারী ও পরিকল্পনাকারীদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে?


