৮৭ শতাংশের বিএনপিকে ‘না’; অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তাহীনতায় চূড়ান্ত ব্যর্থ বিএনপি সরকার
আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম
ক্ষমতায় আসার ছয় মাস পার করলো ঘটিবাটির ছক্কার বিএনপি সরকার। এই ছয়মাস নিতান্ত কম সময় নয় যে জনগণের প্রত্যাশা ও সরকারের বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে কিনা তার কোনো ধারণাই পাওয়া যাবে না। ইঞ্জিনিয়ারিং নির্বাচনের আগে পরিবর্তনের যে বিপুল প্রত্যাশার ফাঁপা ডেস্কি বাজিয়েছিল বিএনপি, ক্ষমতায় আসার পর কয়েক মাসের মধ্যেই মানুষ সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার যেন মরু আর তরুর পার্থক্য। আর সেই জায়গাতেই বিএনপি সরকারের সামনে জনগণের রায়- বিএনপি আস্থাহীনতার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছেছে।
ডয়চে ভেলের (DW) সাথে যৌথ নীরিক্ষায় আমি বিএনপি সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে কিনা এই প্রশ্নে ৮৭ শতাংশ সাধারণ জনগণ সরাসরি উত্তর দিয়েছে ‘না’। জরিপটির পদ্ধতি, নমুনা ও প্রতিনিধিত্বশীলতা যাচাই করেই এই সংখ্যাকে আপামর জনগণের মতামত হিসেবে বলা যায়। এটি নির্ভরযোগ্য জনমতের প্রতিফলন, এটি বিএনপি সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক সতর্কসংকেত। কারণ সরকারের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু ক্ষমতা নয়; জনআস্থা।
প্রায় ৭৮ শতাংশ মানুষ প্রশ্ন তুলেছে সাধারণ মানুষের জীবনে সরকার কোথায়! আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলো রাজনৈতিক বক্তৃতায় নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। বেকারত্ব ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ সর্বোচ্চ, চাকরির বাজারে নতুন সুযোগ তৈরির বদলে বহু খাতেই কর্মসংস্থান সংকোচন, একের পর এক গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হওয়া, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ও বিনিয়োগের মারাত্মক সংকট এবং নতুন কর্মসংস্থানের দুর্বলতা তরুণদের সামনে ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। যে দেশে লাখ লাখ তরুণ প্রতিবছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, সেখানে চাকরির সুযোগ যদি বাড়ার পরিবর্তে সংকুচিত হয়, তাহলে সেটি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাও। অন্যদিকে শিল্পখাতের দুরবস্থা, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং ব্যবসায়িক চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা অর্থনীতিকে ধ্বসিয়ে দিয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় শূন্যে। তাছাড়া শেখ হাসিনাকে প্রত্যায়িত প্রত্যাশিত বিনিয়োগ আনতেও এই সরকারের ব্যর্থতার মাত্রা অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সুযোগ শূন্যে নামিয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া কিংবা ইউরোপের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের সুযোগ সংকুচিত হতে হতে বাংলাদেশ এখন কার্যত বিশাল এইসব শ্রমবাজার হারিয়ে ফেলেছে। এটি যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- তা বোঝার লোক কোথায় সরকারে? প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভরসা। শ্রমবাজারে সুযোগ কমে গেলে তার অভিঘাত সরাসরি পড়ে পরিবার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
অর্থনীতির আরেকটি বড় উদ্বেগ এখন ব্যাংকিং খাত। ব্যাংকে তারল্যসংকট, ঋণখেলাপিদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ চেহারা, আমানতকারীদের চূড়ান্ত অনাস্থা এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় পুরো অর্থনীতিই চাপে পড়ে গিয়েছে। শিল্পে বিনিয়োগের জন্য অর্থ প্রয়োজন, ব্যবসার জন্য ঋণ প্রয়োজন, মানুষের সঞ্চয়ের নিরাপত্তা প্রয়োজন, ব্যাংকিং খাত দুর্বলতম হওয়ায় এই তিন ক্ষেত্রেই আস্থার সংকট এখন সর্বোচ্চ।
এর সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিয়মিততা বা ঘাটতি সীমাহীন, পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে গড়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি তিনভাগের দুইভাগ। তাহলে শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া স্বাভাবিক। কারখানায় বিদ্যুৎ নেই, শিল্পে গ্যাস নেই, বিনিয়োগে আস্থা নেই- এই তিনটি একসঙ্গে চলতে পারে না। একটি সরকার যতই অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলুক, উৎপাদনমুখী অর্থনীতির জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো নিশ্চিত করতেই হবে; যেখানে বিএনপি চূড়ান্ত ব্যর্থ।
অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আরও ভয়াবহ। খুন, হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই, হামলা, সংঘর্ষ ও বিভিন্ন ধরনের অপরাধের খবর যখন নিয়মিত সামনে আসে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়। রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্বগুলোর একটি হলো নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মানুষ যদি ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে ফিরতে পারবে কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে, তাহলে সরকারের অন্য সব সাফল্যও প্রশ্নের মুখে পড়ে। গড়ে বাংলাদেশে দৈনিক খুন ৩৩ জন যা আইনশৃঙ্খলার সর্বোচ্চ অবনতি। একইভাবে হাম, ডেঙ্গু কিংবা অন্যান্য সংক্রামক রোগে মৃত্যু বাড়ছে এমন খবর যখন সামনে আসে, তখন স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। চিকিৎসা ব্যবস্থা যদি পর্যাপ্ত জনবল, ওষুধ, হাসপাতাল, জরুরি চিকিৎসা ও রোগ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারে, তাহলে স্বাস্থ্যঝুঁকি দ্রুত জনআস্থার সংকটে পরিণত হয়। একজন অসুস্থ মানুষের কাছে সরকারের রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে হাসপাতালের বেড, চিকিৎসক, ওষুধ এবং সময়মতো চিকিৎসা পাওয়াই বাস্তব রাষ্ট্রের পরিচয়।
জনগণের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সংকট ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। একজন তরুণ যদি চাকরি না পান, একজন কর্মী যদি চাকরি হারানোর আতঙ্কে থাকেন, একজন উদ্যোক্তা যদি বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিত না হন, একজন শ্রমিক যদি বিদেশে যাওয়ার সুযোগ হারান, একজন ব্যবসায়ী যদি গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চয়তা না পান এবং একজন সাধারণ নাগরিক যদি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন তাহলে এসব বিচ্ছিন্ন সমস্যা থাকে না। এগুলো একত্রিত হয়ে সরকারের প্রতি মানুষের সামগ্রিক আস্থাকে প্রভাবিত করে। এখানেই ৮৭ শতাংশের ‘না’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি প্রতিনিধিত্বশীল জরিপের ফফলাফল। এটি শুধু রাজনৈতিক সমালোচনা হিসেবে না দেখে মানুষের অসন্তোষের গভীর কারণ অনুসন্ধান। সাধারণ মানুষ যখন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে, তখন অনেক সময় তারা আসলে সরকারের নীতির চেয়েও নিজের জীবনের বাস্তব সমস্যার কথা বলে।
ক্ষমতায় আসা সহজ, আস্থা ধরে রাখা কঠিন। ইঞ্জিনিয়ারিং নির্বাচনে জয় একটি রাজনৈতিক দলের বড় ‘অর্জন’। কিন্তু নির্বাচনী বিজয় হলো ক্ষমতায় যাওয়ার পথ; জনআস্থা হলো ক্ষমতায় থাকার ভিত্তি। মানুষ পাঁচ বছর অপেক্ষা করে সরকারকে মূল্যায়ন করে না। প্রতিদিনই মূল্যায়ন করে। বাজারে, কর্মস্থলে, হাসপাতালে, থানায়, ব্যাংকে, কারখানায় এবং নিজের পরিবারের মাসিক বাজেটে। বেকারত্ব কমানো, শিল্প ও গার্মেন্টস খাতকে সচল করা, বিনিয়োগ বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা, শ্রমবাজার পুনরুদ্ধার করা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং আইনশৃঙ্খলার স্বাভাবিকতা এসব ক্ষেত্রেই সরকারের কার্যকর ও দৃশ্যমান সাফল্য দরকার পড়ে; যেখানে সাধারণ জনগণের লেটার মার্ক শেখ হাসিনার ঝুলিতে আজো বিদ্যমান।
বিএনপি সরকারের পতনের অ্যালার্ম বেজেছে। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিল্প, ব্যাংক, জ্বালানি, স্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলা এতগুলো ক্ষেত্রের সংকট যদি একই সময়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে চাপ তৈরি করে, তাহলে সেটিকে হালকাভাবে দেখারও সুযোগ নেই। জনরোষ এখন সর্বোচ্চ। মানুষের হাতে চাকরি দিয়ে, কারখানায় উৎপাদন ফিরিয়ে, বাজারে স্বস্তি এনে, ব্যাংকে আস্থা ফিরিয়ে, গ্যাস-বিদ্যুৎ নিশ্চিত করে, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করে এবং চিকিৎসাব্যবস্থাকে কার্যকর করে শেখ হাসিনা যে দেশকে মাঝারি অর্থনীতির শক্তপোক্ত জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন, মাত্র দুইবছরের ব্যবধানে সেই দেশ এখন ধ্বসে যাচ্ছে। বিএনপি সরকারের সামনে তাই এখন প্রশ্ন একটাই ৮৭ শতাংশের ‘না’কে কি তারা রাজনৈতিক অপবাদ হিসেবে দেখবে, নাকি জনগণের দেওয়া পতনের আগে শেষ সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করবে! জনগণের চূড়ান্ত রায়ে বাংলাদেশ সর্বগামী।
আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


