গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমছে, আর তার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকেও। এবার সেই সংকটের সরাসরি শিকার চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। পিডিবির দুটি জরুরি ফিডার সংযোগ থাকার পরও জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ ঘাটতির কাছে হার মানছে বিমানবন্দর। দিনে ১০ থেকে ১২ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। আর রাতের বেলায় বিদ্যুৎ চলে গেলেই জেনারেটর চালু হওয়ার আগের ৩০ থেকে ৪০ সেকেন্ড অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে বিমানবন্দরের বিভিন্ন অংশ।
দেশের একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা, সেখানেও যদি দিনে এক ডজনবার বিদ্যুৎ চলে যায়- তাহলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার চিত্রটি কতটা ভয়াবহ, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
শাহ আমানত বিমানবন্দরে পিডিবির দুটি জরুরি ফিডার সংযোগ রয়েছে। সাধারণ পরিস্থিতিতে একটি সংযোগে সমস্যা হলে অন্যটি দিয়ে সরবরাহ চালু রাখার সুযোগ থাকার কথা। কিন্তু জাতীয় গ্রিডেই যখন পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ নেই, তখন জরুরি সংযোগও কার্যত অসহায়।
ফলে বিমানবন্দরও এখন নিয়মিত লোডশেডিংয়ের তালিকায়। দিনে ১০ থেকে ১২ বার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনায় বিমানবন্দরের স্বাভাবিক পরিবেশেও তৈরি হচ্ছে অস্বস্তি। যাত্রীদের অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর বিমানবন্দরের নিজস্ব জেনারেটর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা প্রয়োজন অনুযায়ী চালু করা হলেও সেটি সচল হতে সময় লাগে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ সেকেন্ড। এই সামান্য সময়ই রাতে বিমানবন্দরের বিভিন্ন অংশকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
অবশ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, অপারেশনাল যন্ত্রপাতিতে আলাদা আইপিএস ও ব্যাকআপ থাকায় বিমান ওঠানামা বা গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না। অর্থাৎ মূল সংকট এখনো ‘অপারেশনাল’ পর্যায়ে না গেলেও বিমানবন্দরের আলো-আলোকসজ্জা ও যাত্রীসেবায় এর প্রভাব স্পষ্ট।
চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে গ্যাসের ঘাটতি। গ্যাসের অভাবে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে জাতীয় গ্রিডে তৈরি হচ্ছে বিদ্যুতের ঘাটতি, আর সেই ঘাটতি সামাল দিতে বাড়ছে লোডশেডিং।
চট্টগ্রামে দৈনিক প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও কোনো কোনো দিন সরবরাহ নেমে আসছে মাত্র ১৮০ থেকে ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ প্রায় অর্ধেক।
ফলাফলও চোখের সামনে- শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত, সিএনজি স্টেশনে সংকট, আবাসিক গ্রাহকের ভোগান্তি এবং এখন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট।
চট্টগ্রামের গ্যাস পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে এলএনজি সরবরাহের অনিশ্চয়তা। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালগুলো থেকে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে চাপ বাড়ছে।
গত ১৯ আগস্ট এলএনজি কার্গোর সংকটে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর আসে। এর ফলে এমনিতেই সংকটে থাকা গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও চাপ তৈরি হয়েছে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আপাতত জেনারেটর ও আইপিএস দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। কিন্তু জেনারেটর ও ব্যাকআপ ব্যবস্থা দিয়ে কি জাতীয় বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান সম্ভব?
একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে যদি নিয়মিত লোডশেডিংয়ের মধ্যে রাখতে হয় এবং রাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর যাত্রীদের কয়েক সেকেন্ডের জন্যও অন্ধকারে দাঁড়াতে হয়, তাহলে সেটি শুধু বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনা নয়- এটি দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার গভীর সংকটেরই একটি দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি।


