পাকিস্তানের কুখ্যাত গ্যাংস্টার ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধচক্রের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি শাহজাদ ভাট্টি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘৩৩৩’ নামেও পরিচিত এই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে অনলাইনভিত্তিক একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ভারতীয় তরুণদের প্রভাবিত করে তাদের অপরাধ ও কথিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার অভিযোগে সম্প্রতি দেশটিতে ব্যাপক অভিযান চালানো হয়েছে।
গত ১২ আগস্ট একদিনেই ভারতের ১৪টি রাজ্য থেকে ২৫০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তরুণদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আকৃষ্ট করা এবং অপরাধী নেটওয়ার্কে যুক্ত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছিল। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও ভাট্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযানের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
শাহজাদ ভাট্টির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উপস্থিতি দেখলে প্রথমে সেটিকে কোনো অপরাধী চক্রের প্রচারমাধ্যম বলে মনে নাও হতে পারে। জনপ্রিয় পাঞ্জাবি গান, বলিউডের সিনেমার সংলাপ, ঝকঝকে ভিডিও, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন ক্লিপ এবং জনপ্রিয় হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে তৈরি করা হয় এসব কনটেন্ট।
এসব কনটেন্টের আড়ালে গড়ে উঠেছে ভাট্টির একটি বিস্তৃত অনলাইন নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কের বড় অংশ পরিচালনায় স্বেচ্ছাসেবী তরুণদের ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে দরিদ্র ও অপরাধপ্রবণতার ঝুঁকিতে থাকা এমন তরুণদের টার্গেট করা হয়, যারা দ্রুত অর্থ, পরিচিতি ও প্রভাব পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় অপরাধজগতে প্রবেশে আগ্রহী হতে পারে।
এনডিটিভির ডেটাফাইয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইউটিউবজুড়ে ভাট্টির বিস্তৃত অনলাইন উপস্থিতি রয়েছে। শুধু ‘শাহবাজ ভাট্টি’ নামেই সক্রিয় অ্যাকাউন্ট ও পেজের সংখ্যা দুই ডজনের বেশি। সবগুলো মিলিয়ে অনুসারীর সংখ্যা এক কোটির বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এটি তার সামগ্রিক অনলাইন উপস্থিতির একটি অংশমাত্র।
এর পাশাপাশি ‘৩৩৩’ ও ‘সফটওয়্যার আপডেট’ নাম বা শব্দ ব্যবহার করে আরও বহু অ্যাকাউন্ট পরিচালিত হচ্ছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। পাকিস্তানে থাকা তরুণ ভিডিও এডিটররা ভাট্টির পুরোনো ভিডিও নতুন করে সম্পাদনা করে এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ‘৩৩৩’ সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিলেও থেমে নেই ভাট্টির অনলাইন কার্যক্রম। নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে অনুসারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখছেন তিনি।
ভিডিও এডিটরদের সঙ্গেও নিয়মিত গ্রুপ ভিডিও কলে যুক্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এক ভিডিও বার্তায় ভাট্টি তার ‘এডিটর ভাইদের’ ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, তারা তার ভিডিও ডাউনলোড করে সম্পাদনা এবং পুনরায় পোস্ট করছেন এবং তাকে বড় ভাই হিসেবে বিবেচনা করছেন।
ভাট্টির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিলাসবহুল গাড়ির বহর, অস্ত্রের প্রদর্শন, বাঘ-সিংহের সঙ্গে ছবি ও ভিডিও, বিদেশ ভ্রমণ এবং জনপ্রিয় পাঞ্জাবি গান ও সিনেমার সংলাপ ব্যবহার করে তৈরি নানা কনটেন্ট দেখা যায়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে, এসব কনটেন্টের মাধ্যমে ভাট্টি নিজেকে একজন প্রভাবশালী, সাহসী ও দরিদ্রবান্ধব ‘রবিন হুড’ ধাঁচের গ্যাংস্টার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত ও অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের কাছে তার বিলাসবহুল জীবনযাপন ও মাফিয়া-ধাঁচের ভাবমূর্তিকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
বিদেশে অবস্থান করেও ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাবলিতে নজর রাখেন ভাট্টি- এমন অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন স্পর্শকাতর ঘটনা নিয়ে ভিডিও প্রকাশ করে তিনি বিভাজনমূলক বক্তব্য ছড়ানোর চেষ্টা করেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে পাঞ্জাবের গুরদাসপুরে রণজিৎ সিং নামের এক তরুণ নিহত হওয়ার ঘটনায় একটি ভিডিও প্রকাশ করেন ভাট্টি। তিনি ঘটনাটিকে ‘ভুয়া এনকাউন্টার’ দাবি করে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ওই তরুণকে টার্গেট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
এ ছাড়া ভারতীয় মুসলিম তরুণদের আকৃষ্ট করতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য বা ক্ষতির অভিযোগ তুলে বিভিন্ন বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব বক্তব্যের মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ ও বিভাজন উসকে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
১২ আগস্ট ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ব্যাপক গ্রেপ্তারের পরও অনলাইন কার্যক্রম বন্ধ করেননি ভাট্টি। ওই অভিযানের পর তিনি নতুন একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট খুলেছেন বলে জানা গেছে।
নতুন অ্যাকাউন্টের প্রথম ভিডিওতে ভারতে থাকা অনুসারীদের সতর্ক করে তিনি অ্যাকাউন্টটি অনুসরণ না করতে এবং পোস্টে লাইক বা মন্তব্য না করার পরামর্শ দেন। ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো যাতে অনুসারীদের শনাক্ত করতে না পারে, সে কারণেই এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভাট্টির সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে সরাসরি বার্তা পাঠানোর কথাও বলা হয়েছে।
এনডিটিভির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ভাট্টির মাফিয়া-ধাঁচের জীবনযাপন ও অনলাইন প্রচারণা ভারতের এক শ্রেণির তরুণকে আকৃষ্ট করছে। তাদের কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাট্টির প্রতি আনুগত্য প্রকাশের পাশাপাশি তার নির্দেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছে।
পাঞ্জাবের গ্রামীণ এলাকার এক তরুণ ভাট্টির একটি ভিডিওতে মন্তব্য করে তাকে আশ্বস্ত করে যে, প্রয়োজন হলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করবে এবং কার বাড়িতে বোমা হামলা করতে হবে, সেই ব্যক্তির নামও দিতে পারবে বলে জানায়।
আরমান দীপ নামের পাঞ্জাবের আরেক তরুণ অমৃতসরভিত্তিক একটি নিরাপত্তা সংস্থার পোশাক পরা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। পরে ভাট্টির একটি ভিডিওতে মন্তব্য করে তার সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
শাহজাদ ভাট্টির বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। মহারাষ্ট্রের রাজনীতিক বাবা সিদ্দিকির হত্যাকারীকে ভারত থেকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া গত বছর পাঞ্জাবের গুরদাসপুরের একটি থানায় গ্রেনেড হামলার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও ওঠে ভাট্টির বিরুদ্ধে।
প্রায় সাত বছর আগে তিনি পাকিস্তান ছেড়ে বিদেশে চলে যান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিও ও পোস্ট বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করে তিনি তার অনলাইন নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন।
ভাট্টির নেটওয়ার্কের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধী ভাবমূর্তিকে ‘গ্ল্যামারাইজ’ করা। বিলাসবহুল জীবন, অর্থ, অস্ত্র, জনপ্রিয় গান ও চলচ্চিত্রের দৃশ্যের সঙ্গে অপরাধজগতের পরিচিতিকে মিশিয়ে তরুণদের কাছে একটি কৃত্রিম আকর্ষণ তৈরি করা হচ্ছে।


