খামারির দাম বাড়ল ৩ টাকা, ভোক্তার খরচ বাড়ল ১০ টাকা; বাড়তি টাকার হিসাব কোথায়?
খামারির কাছ থেকে ৪ শতাংশ চর্বিযুক্ত এক লিটার দুধ ৫৩ টাকা দরে কিনছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড- মিল্ক ভিটা। অথচ সেই দুধ প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত করে ভোক্তার কাছে বিক্রি করা হচ্ছে ১১০ টাকায়। অর্থাৎ খামারির দুধের ক্রয়মূল্য যেখানে মাত্র ৩ টাকা বাড়ানো হয়েছে, সেখানে ভোক্তার ওপর চাপানো হয়েছে অতিরিক্ত ১০ টাকা।
এই মূল্যবৈষম্যকে ঘিরে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যয় ব্যবস্থাপনা, মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
কারণ, খামারিরা বলছেন তাদের উৎপাদন খরচই লিটারপ্রতি ৫৫ টাকার বেশি। অথচ তাদের কাছ থেকে দুধ কেনা হচ্ছে ৫৩ টাকায়। অন্যদিকে একই দুধ প্রক্রিয়াজাত করে ভোক্তার কাছে ১১০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে একদিকে উৎপাদক লোকসানে, অন্যদিকে ভোক্তার ওপর বাড়তি মূল্য- মাঝখানের এই বিশাল ব্যবধানের প্রকৃত হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
খামারির কাছ থেকে ৫৩ টাকায় এক লিটার দুধ কেনার পর সেটি ১১০ টাকায় বিক্রি করছে মিল্ক ভিটা। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চিলিং, প্যাকেজিং, পরিবহন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, এলপিজিসহ বিভিন্ন ব্যয় বেড়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এই ৫৩ টাকা থেকে ১১০ টাকা পর্যন্ত মূল্যের ব্যবধানের কত টাকা প্রকৃত উৎপাদন ও বাজারজাত ব্যয়, আর কত টাকা প্রশাসনিক বা অন্যান্য ব্যয়?
সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে মিল্ক ভিটার আয়-ব্যয়, উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন ব্যয়, প্যাকেজিং ব্যয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশাসনিক ব্যয় এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা স্পষ্ট হতে পারে।
মিল্ক ভিটার মূল উদ্দেশ্য শুধু মুনাফা করা নয়; খামারিদের কাছ থেকে ন্যায্য দামে দুধ সংগ্রহ এবং সাধারণ মানুষের কাছে তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে দুধ সরবরাহ করাও এর অন্যতম লক্ষ্য।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, খামারিরা উৎপাদন খরচের নিচে দুধ বিক্রি করার অভিযোগ করছেন। অন্যদিকে ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে ১১০ টাকা দরে।
এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে- সরকারি প্রতিষ্ঠানটি কার স্বার্থে মূল্য নির্ধারণ করছে? খামারি ও ভোক্তার স্বার্থে, নাকি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যয় ও ব্যবস্থাপনার চাপ সামলাতে?
কারখানার বিদ্যুৎ বিল, এলপিজি ক্রয়, পরিবহন ব্যয়, প্যাকেজিং সামগ্রী ক্রয় এবং অন্যান্য খাতে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে- এসবের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ না হলে মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কোনো ধরনের অপচয় বা ব্যবস্থাপনাগত অনিয়ম রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
খামারিদের বক্তব্য অনুযায়ী, এক লিটার দুধ উৎপাদনেই খরচ হচ্ছে ৫৫ টাকার বেশি। অথচ মিল্ক ভিটা দিচ্ছে ৫৩ টাকা।অন্যদিকে খোলাবাজারে অনেক খামারি একই দুধ ৭০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি করতে পারছেন।
এতে প্রশ্ন উঠছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুধ সরবরাহ করে খামারিরা যদি লোকসানে পড়েন, তাহলে মিল্ক ভিটার সরবরাহব্যবস্থার প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা?
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর আলমও মিল্ক ভিটার ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের বড় ব্যবধানকে অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট- শুধু ব্যয় বেড়েছে বললেই মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি শেষ হয়ে যায় না; ব্যয়ের প্রকৃত হিসাবও জনগণের সামনে আসা প্রয়োজন।
এ জন্য মিল্ক ভিটার গত কয়েক বছরের ক্রয়-বিক্রয় হিসাব, অডিট রিপোর্ট, প্যাকেজিং ও পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয়, সরবরাহকারী নির্বাচন এবং প্রশাসনিক ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা প্রকাশ করা হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।
কারণ জনগণের অর্থ ও স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে শুধু দাম বাড়ানোর ঘোষণা যথেষ্ট নয়- দাম কেন বাড়ল, বাড়তি টাকা কোথায় যাচ্ছে এবং সেই অর্থের প্রতিটি টাকার জবাবদিহি কে করবে- তার উত্তরও জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।


