দেশে হাম পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের পাঁচ মাসে হামে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০২ জনে। সর্বশেষ মারা যাওয়া শিশুদের ছয়জন ঢাকায় এবং দুজন সিলেটে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। একই সময়ে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আরও ৭৯৮ শিশু।
শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণে এ ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
চলতি বছরের মার্চের শুরুতে দেশের কয়েকটি এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা ছড়িয়ে পড়ে ৬৪ জেলায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ৫ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি চালানো হলেও প্রশ্ন উঠেছে- এত বড় সংক্রমণের পরও কেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা গেল না? কেন এত শিশুর প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব হলো না?
বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি সংক্রামক রোগের স্বাভাবিক বিস্তার নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের টিকাদান ঘাটতি, নজরদারির দুর্বলতা এবং সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারার মতো একাধিক ব্যর্থতা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণও উদ্বেগজনক। সংস্থাটির সর্বশেষ সাপ্তাহিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হামে মৃতদের প্রায় ৯০ শতাংশ কোনো টিকাই পায়নি। এক ডোজ টিকা পেয়েছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ এবং দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও মারা গেছে ২ দশমিক ১৯ শতাংশ। আবার মৃতদের ৫১ শতাংশের এমআর টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি।
অর্থাৎ, শুধু টিকা দেওয়ার ঘোষণা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কোন বয়সের শিশু ঝুঁকিতে, কারা টিকার আওতার বাইরে, কারা এক ডোজ নিয়ে দ্বিতীয় ডোজ পায়নি এবং টিকা নেওয়ার পরও কারা আক্রান্ত হচ্ছে- এসব তথ্যের ভিত্তিতে ধারাবাহিক নজরদারি ও ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি ছিল।
বর্তমান বিপর্যয়ের পেছনে কয়েকটি বড় ত্রুটির কথা উঠে এসেছে। ২০২৪ সালে হাম-রুবেলার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি না হওয়া, নিয়মিত টিকাদানে গাফিলতি, ব্যাপক সংক্রমণের পরও হামকে জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি হিসেবে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া এবং সর্বশেষ বিশেষ গণটিকা কর্মসূচিতে প্রায় ৪০ লাখ শিশু বাদ পড়ে যাওয়া- সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, গণটিকাদান কর্মসূচির পরও কতটা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়েছে, আক্রান্ত ও মৃত শিশুদের কত শতাংশ টিকা নিয়েছিল কিংবা টিকা নেওয়ার পরও কেন তারা আক্রান্ত হলো- এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জনসমক্ষে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি।
ফলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে, অন্যদিকে প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।
বিশেষজ্ঞ ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক নজরুল ইসলামের মতে, ছয় মাসের কম বয়সি শিশুদের সরাসরি হামের টিকা দেওয়া যায় না। এ বয়সে তাদের সুরক্ষার বড় মাধ্যম মায়ের কাছ থেকে পাওয়া মাতৃ-প্রতিরোধ ক্ষমতা। মায়েরা শৈশবে টিকা না পেলে সন্তানও পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিয়ে জন্মাতে নাও পারে।
অন্যদিকে শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আতিয়ার রহমান বলেছেন, টিকা নেওয়ার পর পূর্ণ রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগে। তাই বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে দ্রুত টিকার আওতায় আনা এবং প্রয়োজনে পুনরায় গণটিকা কর্মসূচি চালানো জরুরি। পাশাপাশি আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন রোগীকে দ্রুত শনাক্ত করে আইসোলেশনে রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
একটি শিশুর মৃত্যু একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। সেখানে মাত্র পাঁচ মাসে হামে ৯০২ শিশুর মৃত্যু নিছক পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা।
টিকাদান কর্মসূচি থাকলেও যদি লাখ লাখ শিশু তার বাইরে থেকে যায়, সংক্রমণের পরও যদি দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, আক্রান্তদের তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী শনাক্ত করা না হয় এবং আগাম সতর্কতার পরিবর্তে পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়- তাহলে এমন বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে ওঠে।
কারণ হামে আরও একটি শিশুর মৃত্যু মানেই শুধু একটি প্রাণের মৃত্যু নয়- এটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আরেকটি ব্যর্থতার সাক্ষ্য। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ৯০২-এর এই ভয়াবহ সংখ্যা আরও কত দূর গড়াবে, সেটিই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা।


