৮০ শতাংশ শিক্ষার্থীই হলের বাইরে, বাড়ছে খরচ-ভোগান্তি; নতুন হল না বাড়িয়েই শিক্ষার্থী বৃদ্ধির অভিযোগ
মেধার প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হয়ে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও আবাসন সুবিধা মিলছে না অধিকাংশ শিক্ষার্থীর। দেশের ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৮০ শতাংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের বাইরে থাকছেন। মেস, ভাড়া বাসা, সাবলেট কিংবা ক্যাম্পাস-সংলগ্ন কটেজে বাধ্য হয়ে বসবাস করতে গিয়ে বাড়ছে তাদের শিক্ষা ব্যয়, যাতায়াতের দুর্ভোগ ও মানসিক চাপ।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ ৫০তম বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিভুক্ত কলেজ বাদে ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ৫১ লাখ ৭৯ হাজার ৫৭৯ জন। এর মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত শিক্ষার্থী বাদ দিলে বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থী ৪৮ লাখ ২১ হাজার ১৬৫ জন।
অন্যদিকে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী ৩৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৪৫ জন, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৫৪১ জন এবং ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ফাজিল ও কামিল স্তরের শিক্ষার্থী ৫ লাখ ৩ হাজার ৫৮০ জন।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ২৩২টি আবাসিক হল ও ডরমিটরিতে আসন রয়েছে মাত্র ১ লাখ ৫ হাজার ৭৮৭টি। ফলে বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধার বাইরে থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৭৯ দশমিক ৮১ শতাংশ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
শিক্ষার্থী বাড়ছে, বাড়ছে না আবাসন
শিক্ষার্থী সংখ্যা ক্রমাগত বাড়লেও সেই অনুপাতে আবাসিক অবকাঠামো গড়ে না ওঠায় দীর্ঘদিনের এই সংকট এখন অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে। কোথাও একটি হলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে, আবার কোথাও নতুন বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলেও নিজস্ব ক্যাম্পাস পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি।
প্রয়োজনীয় আবাসন নিশ্চিত না করে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগ ও আসন বাড়ানোর নীতিই সংকটকে আরও গভীর করেছে। ফলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর নামে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশকে কার্যত আবাসনহীন অবস্থায় রেখে দেওয়া হচ্ছে।
১৯ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য হল মাত্র একটি
আবাসন সংকটের সবচেয়ে প্রকট উদাহরণ রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। প্রায় ১৯ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে আবাসিক হল রয়েছে মাত্র একটি। সেখানে থাকার সুযোগ পান আনুমানিক ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে মেস ও ভাড়া বাসার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মাহাতির হাসানের বাড়ি নড়াইলে। শান্তিনগরে দুই বন্ধুর সঙ্গে একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে থাকেন তিনি। শুধু বাসাভাড়া বাবদ মাসে খরচ হয় ৪ হাজার ২০০ টাকা। খাবার ও যাতায়াতসহ মাসিক ব্যয় দাঁড়ায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা।
মাহাতির বলেন, ভাড়া বাসায় থাকার বাড়তি খরচের পাশাপাশি প্রতিদিন শান্তিনগর থেকে পুরান ঢাকায় যাতায়াত করতে হয়। যানজটে প্রতিদিনই নষ্ট হয় গুরুত্বপূর্ণ সময়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু পরিবারের আর্থিক চাপই বাড়ছে না, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রীদের আবাসন সংকট প্রকট
দেশের অন্যতম প্রাচীন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও দীর্ঘদিন ধরে আবাসন সংকটে ভুগছে। তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫৭ শতাংশ ছাত্রী এবং ৩৪ শতাংশ ছাত্র ক্যাম্পাসের বাইরে থাকছেন।
আবাসন সংকট সামাল দিতে কোথাও গণরুম, কোথাও অতিরিক্ত কক্ষে শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। ছাত্রীদের জন্য নতুন হল নির্মাণের কথা দীর্ঘদিন ধরে বলা হলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। পুরোনো হলগুলোর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও নিরাপত্তা সমস্যাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
বেগম রোকেয়া হলের অনাবাসিক শিক্ষার্থী নন্দিনী আহসান পরিবারের সঙ্গে কেরানীগঞ্জে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত এসে সেখান থেকে আরও প্রায় ৪০ মিনিট যাতায়াত করতে হয় তাঁকে। প্রতিদিন দীর্ঘ সময় যাতায়াতে ব্যয় হওয়ায় ক্লাস, পড়াশোনা ও অন্যান্য একাডেমিক কর্মকাণ্ডে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে হলে ঠাঁই মাত্র ১৯ শতাংশের
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও আবাসন সংকট ভয়াবহ। প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন মাত্র ১৯ শতাংশ। ১৫টি আবাসিক হলের মধ্যে ১০টি ছাত্রদের এবং পাঁচটি ছাত্রীদের জন্য।
ফলে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের আশপাশের কটেজ, মেস ও ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। আবাসনের চাহিদাকে কেন্দ্র করে ভাড়া বাড়ানোর অভিযোগও রয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে খাবার ও যাতায়াতের বাড়তি ব্যয়।
যশোর থেকে চট্টগ্রামে পড়তে আসা সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মাসুদুর রহমান বলেন, বাইরে থাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো থাকা ও খাবারের ব্যয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য এই অতিরিক্ত খরচ বহন করা কঠিন।
নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, পুরোনো সংকট
নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুব একটা ভিন্ন নয়। রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৯২ শিক্ষার্থীর বিপরীতে আবাসন সুবিধা রয়েছে মাত্র ১৮০ জনের। অর্থাৎ প্রায় ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থীই হলের বাইরে থাকছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়টির দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী দীপ্ত বড়ুয়া এখনও হলের আসন পাননি। শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরের একটি মেসে থাকেন। শুধু মেস ভাড়া বাবদ তাঁর মাসে ব্যয় হয় ৩ হাজার টাকা। এর সঙ্গে খাবার ও যাতায়াতের খরচ রয়েছে।
শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রয়োজনের তুলনায় আবাসিক অবকাঠামো এখনও অপ্রতুল। একাডেমিক, প্রশাসনিক ও আবাসিক অবকাঠামো নির্মাণে ১৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদিত হলেও বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কাটেনি।
২৫ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাসই নেই
আবাসিক হল তো দূরের কথা, দেশের ২৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এখনও নিজস্ব পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস নেই। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকগুলোই ভাড়া করা বা অস্থায়ী ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এর মধ্যে রয়েছে জামালপুর, চাঁদপুর, সুনামগঞ্জ, পিরোজপুর, লক্ষ্মীপুর ও নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। রয়েছে খুলনা, হবিগঞ্জ ও কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়; নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি, কিশোরগঞ্জ, মেহেরপুর, নওগাঁ, বগুড়া, ঢাকা সেন্ট্রাল ও ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ও নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস-সংকটে রয়েছে।
‘নতুন হল না করেই শিক্ষার্থী বাড়ানো হয়েছে’
ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএমএ ফায়েজ বলেন, নানা বাস্তবতা ও আর্থিক সক্ষমতার কারণে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন হল নির্মাণ না করেই বিভাগ ও শিক্ষার্থী আসন বাড়ানো হয়েছে। আবাসিক সুবিধা না বাড়িয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ানো উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, হলের আসন সংকট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন সমস্যার অন্যতম কারণ।
আবাসন সংকটের ধাক্কা পড়ছে শ্রেণিকক্ষেও
আবাসন সংকটের প্রভাব শুধু থাকার জায়গাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক জীবনেও। ১৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০০ শিক্ষার্থীকে নিয়ে হিট প্রকল্পের এক গবেষণায় আবাসনের ধরন ও পরিবেশের সঙ্গে ঘুম, শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি, ইন্টারনেট সুবিধা ও একাডেমিক সম্পৃক্ততার সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয়েছে।
গবেষণায় আবাসন পরিবেশের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে কম ঘুম, ক্লাসে কম উপস্থিতি এবং দুর্বল ইন্টারনেট সুবিধার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় অংশের শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসে। তাদের থাকা-খাওয়ার যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে মানসম্মতভাবে পড়াশোনা করা কঠিন। আবাসন সম্প্রসারণের পাশাপাশি মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে হলের আসন বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি।
জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবছর শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ছে, নতুন বিভাগ ও আসন যুক্ত হচ্ছে; কিন্তু সেই তুলনায় আবাসিক অবকাঠামো কতটা সম্প্রসারিত হচ্ছে- এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। দীর্ঘদিনের এই ঘাটতির কারণে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করে মেস বা ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করাই যদি রাষ্ট্রের লক্ষ্য হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের থাকার ন্যূনতম নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কিন্তু আবাসন অবকাঠামোর দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত হল নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে শিক্ষা খাতের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনা নিয়ে।


