১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তখন ইতিহাসের এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। এক পাশে বিজয়ী মিত্রবাহিনী- ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী ও বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী; অন্য পাশে পরাজিত পাকিস্তানি পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজির হাতে অস্ত্র সমর্পণের দলিল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে গেল একটি ভূখণ্ডের রাজনৈতিক পরিচয়। জন্ম নিল স্বাধীন বাংলাদেশ।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত ১৩ দিনের যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরোধ কার্যত ভেঙে পড়ে। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড আত্মসমর্পণ করে মিত্রবাহিনীর কাছে। এই আত্মসমর্পণের পর প্রায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সামরিক ও সংশ্লিষ্ট সদস্য যুদ্ধবন্দি হিসেবে ভারতের হেফাজতে যায়। বাংলাদেশি ঐতিহাসিক সূত্রেও ১৬ ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণকে প্রায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সদস্যের আত্মসমর্পণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিসেম্বরের শুরুতে যুদ্ধ যখন সরাসরি ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে রূপ নেয়, তখন পূর্ববাংলার যুদ্ধক্ষেত্রে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান দ্রুত দুর্বল হতে থাকে। এর আগে প্রায় নয় মাস ধরে মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছিল। চূড়ান্ত পর্যায়ে ভারতীয় বাহিনীর স্থল, নৌ ও বিমান শক্তির সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর সমন্বিত অভিযান পাকিস্তানি প্রতিরোধকে দ্রুত সংকুচিত করে।
মিত্রবাহিনী এক জায়গায় থেমে থেকে দীর্ঘ অবরোধে না গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ, সামরিক ঘাঁটি ও কৌশলগত অবস্থানগুলোকে লক্ষ্য করে দ্রুত অগ্রসর হয়। বিভিন্ন দিক থেকে ঢাকার দিকে চাপ বাড়তে থাকে। পাকিস্তানি বাহিনীর একাধিক ইউনিট পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং তাদের প্রতিরোধের সক্ষমতা ক্রমেই কমতে থাকে।
যে বাহিনী কয়েক মাস ধরে সামরিক শক্তির ওপর ভর করে পূর্ববাংলাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছিল, মাত্র কয়েক দিনের চূড়ান্ত অভিযানে সেই বাহিনীকেই আত্মসমর্পণের পথ বেছে নিতে হয়।
১৬ ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজি আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন। মিত্রবাহিনীর পক্ষে দলিল গ্রহণ করেন ভারতীয় পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা।
এই স্বাক্ষরের সঙ্গে কার্যত অবসান ঘটে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক শাসনের। ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী হয়ে যায় সেই দৃশ্য- একজন পাকিস্তানি জেনারেল আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করছেন, আর চারদিকে বিজয়ের উল্লাস।
১৯৭১ সালের এই আত্মসমর্পণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক আত্মসমর্পণগুলোর একটি হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। প্রায় ৯০ হাজারের বেশি পাকিস্তানি সামরিক ও সংশ্লিষ্ট সদস্যকে যুদ্ধবন্দি করা হয়, যা আধুনিক সামরিক ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
তাই ১৬ ডিসেম্বরের ঘটনা কেবল একটি যুদ্ধের শেষ নয়; এটি ছিল একটি রাষ্ট্রের সামরিক কাঠামোর নাটকীয় পতন এবং একটি নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়।
পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় শুধু একটি সামরিক ব্যর্থতা ছিল না- এটি ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সবচেয়ে বড় বিপর্যয়গুলোর একটি। পূর্বাঞ্চল বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে পরিণত হয়। পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বকে মেনে নিতে হয় এমন একটি পরাজয়, যার পরিণতিতে তাদের দেশেরই একটি অংশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
আর বাংলাদেশের জন্য ১৬ ডিসেম্বর ছিল নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয়।
রেসকোর্স ময়দানে নিয়াজির স্বাক্ষর তাই শুধু একটি আত্মসমর্পণের দলিল নয়- এটি ছিল পাকিস্তানি সামরিক আধিপত্যের পতনের দলিল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্তর্জাতিক বাস্তবতার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
১৩ দিনের চূড়ান্ত যুদ্ধ, প্রায় ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দি এবং ঢাকার মাটিতে পাকিস্তানি পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের আত্মসমর্পণ- এই তিনটি ঘটনা মিলেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরকে সামরিক ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় দিনে পরিণত করেছে।


