যুদ্ধ-অবরোধে জ্বালানি সংকট চরমে, আগুন জ্বালানোর ছোট্ট উপকরণটিও হয়ে উঠেছে দুর্লভ ও ব্যয়বহুল
গাজায় যুদ্ধ ও দীর্ঘস্থায়ী অবরোধে মানুষের জীবনযাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একটি সাধারণ লাইটারও হয়ে উঠেছে বেঁচে থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। রান্নার গ্যাস ও জ্বালানির তীব্র সংকটে কাঠের চুলায় রান্না, রুটি তৈরি, শিশুদের জন্য পানি গরম করা কিংবা এক কাপ চা বানাতেও এখন লাইটারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।
কিন্তু সংকটের কারণে লাইটারও গাজায় এখন দুর্লভ ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। যুদ্ধের আগে যে লাইটার সামান্য দামে সহজেই পাওয়া যেত, সেটিই এখন কিনতে গুনতে হচ্ছে কয়েক ডজন ডলার। ফলে একটি লাইটার একাধিক পরিবারের মধ্যে ভাগাভাগি করে ব্যবহারের ঘটনাও নিয়মিত হয়ে উঠেছে।
গাজা সিটির একটি তাঁবুতে বসে নিজের পুরোনো লাইটার হাতে ৪৬ বছর বয়সী পাঁচ সন্তানের মা রাবাব দেইফাল্লাহ বলেন, তাঁর পরিবারের দৈনন্দিন জীবন এখন পুরোপুরি আগুনের ওপর নির্ভরশীল। কাঠ পুড়িয়ে রুটি বানানো, রান্না করা, সন্তানদের জন্য পানি গরম করা- সবকিছুর শুরুই একটি লাইটার দিয়ে।
রাবাবের ভাষায়, যুদ্ধের আগে এক শেকেলে তিনটি লাইটার পাওয়া যেত। এখন একটি নতুন লাইটারের দাম ২৭ থেকে ৩৩ ডলার পর্যন্ত। পুরোনো লাইটারটি সচল রাখতে তাঁকে সর্বশেষ ১২ ডলার খরচ করে মেরামত করতে হয়েছে।
তাঁর প্রশ্ন, “আমি কি এত টাকা একটি লাইটারের পেছনে খরচ করব, নাকি এক বস্তা ময়দা কিনব?”
অর্থসংকটে থাকা পরিবারগুলোর কাছে খাবার কেনাই যখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার, তখন লাইটার কেনা অনেকের কাছেই বিলাসিতার মতো। ফলে কেউ লাইটার না পেলে প্রতিবেশীর চুলা থেকে আগুন ধার করে আনছেন। কখনো কার্ডবোর্ডে আগুন ধরিয়ে সেটি নিয়ে এসে নিজেদের চুলা জ্বালাতে হচ্ছে। কোনো প্রতিবেশীর ওভেন জ্বললে সেখানে গিয়ে রুটি বানানোর ঘটনাও ঘটছে।
জাবালিয়া শরণার্থীশিবির থেকে বাস্তুচ্যুত ৪৩ বছর বয়সী হাসনা মানসুরের জীবনেও একই বাস্তবতা। ছয় সন্তানের এই মা খাবার তৈরি করে বিক্রি করে সংসারে সহায়তা করেন। রান্নার জন্য তিনি মাটির চুলা ব্যবহার করেন। কিন্তু নতুন লাইটার কেনার সামর্থ্য না থাকায় পুরোনোটিই বারবার মেরামত করে চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
একদিন সকাল থেকে চেষ্টা করেও সকাল ১০টা পর্যন্ত চুলায় আগুন জ্বালাতে পারেননি হাসনা। পরে ছোট মেয়েকে কার্ডবোর্ডের টুকরা হাতে এমন কোনো প্রতিবেশীর সন্ধানে পাঠান, যার চুলায় আগুন জ্বলছে। কিন্তু সেদিনও আগুন জোগাড় করা সম্ভব হয়নি।
এই ঘটনা গাজার মানুষের দৈনন্দিন সংকটের গভীরতা তুলে ধরে- জ্বালানি নেই, গ্যাস নেই; আর আগুন ধরানোর ছোট্ট উপকরণটিও যখন হাতের নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন রান্না করাটাই হয়ে ওঠে বড় চ্যালেঞ্জ।
পণ্য প্রবেশে বিধিনিষেধ, সীমান্তপথ বন্ধ এবং সরবরাহ সংকটের কারণে গাজায় নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু পণ্যের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে পুরোনো পণ্য মেরামত করে পুনরায় ব্যবহারের প্রবণতাও বেড়েছে। এরই মধ্যে লাইটার মেরামতও পরিণত হয়েছে নতুন এক ধরনের পেশায়।
গাজা সিটির পশ্চিমে আল-কারমেল স্কুলের কাছে ছোট একটি স্টল বসিয়ে লাইটার মেরামত করেন ২৪ বছর বয়সী তামের আল-শাওয়িশ। যুদ্ধের আগে তিনি গাড়ি চালাতেন। এখন দুই সন্তানের এই বাবা লাইটার মেরামত করেই পরিবারের খরচ চালানোর চেষ্টা করছেন।
বাস্তুচ্যুত শাদি আবু শামলাহ গাজা সিটির পশ্চিমে আল-কারমেল স্কুলে পরিবারের সঙ্গে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁর দাবি, পুরো স্কুল এলাকায় চারটির বেশি লাইটার নেই। সেই অল্প কয়েকটি লাইটারই ঘুরে ঘুরে ব্যবহার করছেন অসংখ্য মানুষ।
কখনো রান্না, কখনো পানি গরম করা, কখনো শিশুর দুধ প্রস্তুত করা কিংবা এক কাপ গরম চা—প্রয়োজন অনুযায়ী লাইটারটি এক তাঁবু থেকে অন্য তাঁবুতে যাচ্ছে।
লাইটারের ছোট্ট ফ্লিন্ট বা আগুন তৈরির যন্ত্রাংশ কিনতেও এখন ২৫ থেকে ৩০ শেকেল, অর্থাৎ প্রায় ৮ থেকে ১০ ডলার খরচ করতে হচ্ছে। এমনকি লাইটারে গ্যাস ভরার সময়ও ঝুঁকি নিতে হচ্ছে মানুষকে। বড় গ্যাস সিলিন্ডার থেকে ছোট লাইটারে গ্যাস ভরতে গিয়ে কেউ কেউ দগ্ধও হচ্ছেন।
গাজার এই বাস্তবতা দেখিয়ে দিচ্ছে, যুদ্ধের প্রভাব শুধু খাদ্য, পানি ও চিকিৎসার সংকটেই সীমাবদ্ধ নেই। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে ছোট ও সাধারণ প্রয়োজনীয় জিনিসটিও সেখানে এখন দুর্লভ সম্পদ। একটি লাইটার তাই গাজায় কেবল আগুন জ্বালানোর উপকরণ নয়- অনেক পরিবারের কাছে এটি রান্না, উষ্ণতা ও বেঁচে থাকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি অপরিহার্য সামগ্রী।


