দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বছরের প্রথম আট মাসে যে সংখ্যক মানুষ ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছিলেন, সেপ্টেম্বরের মাত্র ২৪ দিনেই সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে। চলতি মাসেই মৃত্যু হয়েছে ১১২ জনের। অথচ জানুয়ারি থেকে আগস্ট- পুরো আট মাসে ডেঙ্গুতে মারা গিয়েছিলেন ৯৭ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাবে, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৭৮২ জন।
এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ১৪৯ জনে। এর মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৬৩ হাজার ৮৭৪ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন আরও ১ হাজার ৭৫৭ জন।
ফলে সেপ্টেম্বর যত গড়াচ্ছে, ততই ভয়াবহ হচ্ছে ডেঙ্গুর চিত্র। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা; একই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল।
সরকারি পরিসংখ্যানেই উঠে এসেছে ডেঙ্গুর ভয়াবহতার এই চিত্র। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে মৃত্যু হয়েছিল ৯৭ জনের। সেপ্টেম্বরের ২৪ দিনেই সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১১২। অর্থাৎ বছরের প্রথম আট মাসের তুলনায় মাত্র ২৪ দিনেই ১৫ জন বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
ডেঙ্গুর মৌসুমে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, শুধু মশা নিধন কার্যক্রম চালিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
তার মতে, এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে নিয়মিতভাবে ধ্বংস করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি আরও জোরদার করা জরুরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জনঘনত্ব, মানুষের চলাচল, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা এবং পানি সংরক্ষণের ধরনও ডেঙ্গুর বিস্তারে ভূমিকা রাখে।
বাড়ি বা আশপাশে জমে থাকা পানিও এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাই নিয়মিত মশার বিস্তার নজরদারি, কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ডব্লিউএইচও।
সংস্থাটি আরও বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ এবং মানুষের চলাচলের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে ডেঙ্গুর ভৌগোলিক বিস্তৃতিও পরিবর্তিত হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ওই বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের।
২০২৪ সালেও ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল উল্লেখযোগ্য। ওই বছর চার শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয় এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ২ হাজার।
চলতি বছরের আট মাসেই মৃত্যু ৯৭ জনে পৌঁছানোর পর সেপ্টেম্বরের মাত্র ২৪ দিনে আরও ১১২ জনের মৃত্যু পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির চিত্র তুলে ধরছে।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় ইতোমধ্যে ছয় মাসব্যাপী জরুরি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর আওতায় উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও সংক্রমণপ্রবণ এলাকার প্রায় ৩ লাখ মানুষকে বিভিন্নভাবে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রামসহ সর্বোচ্চ সংক্রমণপ্রবণ এলাকাগুলোকে কার্যক্রমের আওতায় নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্প ও আশপাশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় ভবিষ্যতে দেশের অন্য এলাকাতেও এই কার্যক্রম সম্প্রসারণের কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির (বিডিআরসিএস) মহাসচিব মো. হাবিবুর রহমান খান বলেন, ডেঙ্গু দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি। রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকেরা স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ডেঙ্গু মোকাবিলায় কাজ করছেন।
তিনি বলেন, উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ এলাকায় আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর পাশাপাশি ডেঙ্গুর স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় পরিবারগুলোকে সহায়তার উদ্যোগও জোরদার করা হচ্ছে।
২৪ দিনে ১১২ মৃত্যু। আট মাসের মৃত্যুকে ছাড়িয়ে গেছে এক মাসেরও কম সময়ের হিসাব। প্রতিদিন হাজারের বেশি নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী চিত্রে সামনে আরও বড় চাপের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


