চিকিৎসক-জনবল সংকট, প্রশ্নের মুখে বন্দিদের চিকিৎসাসেবা
ঢাকার কারাগারে বন্দিদের মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। চলতি সেপ্টেম্বরের মাত্র ২৪ দিনেই কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও কাশিমপুর কারাগারের অন্তত ১০ বন্দির মৃত্যু হয়েছে।
মৃতদের বেশির ভাগই ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অথবা হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে অন্তত তিনজনের বয়স ৪৫ বছরের নিচে।
সবশেষ গত বুধবার রাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকা মেডিকেলে মারা গেছেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দুই বন্দি- মোহাম্মদ ইফতেখার মাহমুদ (৩৬) ও মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসাইন পলাশ (৩৮)।
একই মাসে একের পর এক বন্দির মৃত্যু এবং কারা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট ও প্রশিক্ষিত জনবলের সংকট নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কারাগারের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
কারা সূত্র জানায়, গত ১৯ সেপ্টেম্বর কারাগারের ভেতরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন ইফতেখার মাহমুদ। ওই দিনই তাঁকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার রাত ৯টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বাড়ি রাজধানীর মিরপুরের পীরেরবাগ এলাকায়।
একই রাতে কারাগারে হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়েন হাজতি তোফাজ্জল হোসাইন পলাশ। রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাঁকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হলে রাত সাড়ে ১১টার দিকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর বাড়ি দারুস সালাম থানার বাগবাড়ী এলাকায়।
ঢামেক পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক হাবিবুর রহমান বলেন, মরদেহ দুটির ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
৩ সেপ্টেম্বর অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর মারা যান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দি বাবুল হোসেন (৪৫)। তিনি যাত্রাবাড়ী থানার একটি মাদক মামলার আসামি ছিলেন।
১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মো. রফিকুল ইসলাম (৫৪)। তাঁর বাড়ি কুড়িগ্রামে। ১২ সেপ্টেম্বর মারা যান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের হাজতি আব্দুল বারেক (৭০)। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
পরদিনই মারা যান আরেক বন্দি আব্দুল মাবুদ (৫৮)। মারামারি ও হত্যাচেষ্টার মামলায় কাশিমপুর কারাগারে বন্দি ছিলেন তিনি। অসুস্থ হওয়ার পর তাঁকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। পরে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
গত ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকা মেডিকেলে মারা যান তিন কারাবন্দি। তাঁরা হলেন- আবুল বাশার (৫৮), আবদুল কাইয়ুম (৬২) ও শাহাদাত হোসেন লিটন (৫২)। পরদিন ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে মারা যান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দি আলী আকবর মণ্ডল (৬৭)। কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে কারাগারে বন্দির সংখ্যা এক লাখের বেশি।
তথ্য বলছে, ২০২১ সালে সারাদেশের কারাগারে ৩০৩ বন্দির মৃত্যু হয়। ২০২২ সালে ২২৩, ২০২৩ সালে ৩৭৫, ২০২৪ সালে ৩১৮ এবং ২০২৫ সালে ১৮৭ বন্দি মারা যান। চলতি বছরের ১৬ আগস্ট পর্যন্ত মারা গেছেন ১২২ বন্দি।
কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, কারা হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট ও প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি রয়েছে। ফলে হাসপাতালে থাকা চিকিৎসা সরঞ্জামের একটি অংশও যথাযথভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের হাসপাতালে পাঠানো হলেও চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবলের ঘাটতির কারণে কারাগারের ভেতরের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ বন্দি রয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় চিকিৎসাসুবিধা পর্যাপ্ত নয়।
তাঁর ভাষ্য, কারাগারে খাবারের মান নিয়েও ঘাটতি রয়েছে। পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় কোনো বন্দি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াও সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, কারাবন্দিদের মৃত্যু কমাতে চিকিৎসাসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বন্দিদের চিকিৎসা, খাবার, জরুরি পরিবহনসহ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু ঢাকায় নয়, দেশের অন্যান্য কারাগারেও বন্দিদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
গত ২২ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর জেলা কারাগারের মাদক মামলার এজাহারভুক্ত হাজতি আসাদুজ্জামান শেখ (৪২) ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন ওয়ার্ডে মারা যান। তাঁর বাড়ি ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার বাগাট মুন্সিপাড়া গ্রামে।
একদিকে কারাগারে বন্দির সংখ্যা এক লাখের বেশি, অন্যদিকে চিকিৎসক-জনবলের ঘাটতি ও সীমিত চিকিৎসাসুবিধা- এর মধ্যেই চলতি সেপ্টেম্বরের ২৪ দিনে ঢাকার দুই কারাগারে অন্তত ১০ বন্দির মৃত্যু নতুন করে কারাগারের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন সামনে এনেছে।


