নিভৃতচারী জীবন, আইন পেশায় গভীর নিষ্ঠা আর দেশের স্বার্থে নীরব ভূমিকা- বহুমাত্রিক এই পরিচয়ের মানুষ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী তৌফীক নেওয়াজ আর নেই। আওয়ামী লীগের নেত্রী ও সাবেক মন্ত্রী দীপু মনির স্বামী তৌফীক নেওয়াজকে বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানী কবরস্থানে বাবা আমিনর রহমানের কবরের পাশে দাফন করা হয়েছে।
বাদ জোহর রাজধানীর গুলশান আজাদ মসজিদে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে বেলা পৌনে ৩টার দিকে বৃষ্টির মধ্যে বনানী কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্ত্রী দীপু মনি, মেয়ে দ্বীপান্বিতা নেওয়াজ, স্বজন, বন্ধু ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
তৌফীক নেওয়াজ শুধু আইনজীবী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন না; ব্যক্তিজীবনে ছিলেন অত্যন্ত নিভৃতচারী ও সংস্কৃতিমনা। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি ছিল তাঁর আগ্রহ। পাশাপাশি বাঁশি বাজানো ছিল তাঁর অন্যতম প্রিয় শখ। এমনকি একক বাঁশি পরিবেশনার অনুষ্ঠানও করেছেন তিনি।
শৈশবের বন্ধু আইনজীবী ও রাজনীতিক মহসিন রশীদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে তৌফীক নেওয়াজের এই অন্যরকম জীবনচিত্র। তিনি জানান, তৌফীক ছিলেন শান্ত স্বভাবের মানুষ। ক্রিকেট খেলতেন, নিয়মিত বাঁশি বাজাতেন। তাঁর পরিবারেও বাঁশি বাজানোর চর্চা ছিল। বাবা আমিনর রহমানও বাঁশি বাজাতেন। ছেলে তৌকীর নেওয়াজও বাঁশি বাজান।
ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলে তৌফীক নেওয়াজের শিক্ষাজীবনের সূচনা। তৃতীয় শ্রেণি থেকেই তাঁর সহপাঠী ছিলেন মহসিন রশীদ। পরে ঢাকায় পড়াশোনা শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য অক্সফোর্ডে যান তিনি। সেখানেই প্রখ্যাত আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে ড. কামাল হোসেনের চেম্বারে আইন পেশা শুরু করেন তৌফীক নেওয়াজ।
দীর্ঘ পেশাজীবনে দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সক্রিয় ছিলেন তিনি। শৈশবের বন্ধু মহসিন রশীদের ভাষায়, দেশের প্রতি তৌফীক নেওয়াজের গভীর মমত্ববোধ ছিল। বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণের লড়াইয়ে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
মহসিন রশীদ বলেন, পেশাগত জীবনে তৌফীক নেওয়াজ অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশের স্বার্থে আইন অঙ্গনে তিনি সবসময় সক্রিয় ছিলেন এবং বাংলাদেশের পক্ষে লড়েছেন।
তৌফীক নেওয়াজ মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ও লিভারের নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। ২০১৯ সালে স্ট্রোক করার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।
সর্বশেষ গত ২৭ মে হুইলচেয়ারে করে কারাবন্দি স্ত্রী দীপু মনিকে দেখতে আদালতে নেওয়া হয়েছিল তাঁকে। এরপর আর স্ত্রীকে দেখার সুযোগ হয়নি।
স্বামীর শেষকৃত্যে অংশ নিতে বৃহস্পতিবার ১২ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয় দীপু মনিকে। সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে মুন্সীগঞ্জ কারাগার থেকে কঠোর পুলিশি পাহারায় তাঁকে ঢাকায় আনা হয়। সকাল সোয়া ৮টার দিকে তিনি কলাবাগানের বাসায় পৌঁছান। একই সময়ে তৌফীক নেওয়াজের মরদেহও সেখানে নেওয়া হয়।
স্বামীর মরদেহ শেষবার দেখার অপেক্ষায় সেখানে শোকের আবহ তৈরি হয়। পরে দুপুরের দিকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় গুলশান আজাদ মসজিদে। দীপু মনিকেও প্রিজন ভ্যানে করে সেখানে নেওয়া হয়। জানাজার সময় তিনি ভ্যানের ভেতরেই ছিলেন।
জানাজা শেষে ভ্যান থেকে নেমে শেষবারের মতো স্বামীর মুখ দেখেন দীপু মনি। স্বজনদের বর্ণনায়, তখন সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
পরে বৃষ্টির মধ্যেই বনানী কবরস্থানে তৌফীক নেওয়াজের দাফন সম্পন্ন হয়। বাবা আমিনর রহমানের কবরের পাশেই তাঁকে শায়িত করা হয়। পাশে রয়েছে তাঁর মা খায়রন নেছার কবরও। মেয়ে দ্বীপান্বিতা নেওয়াজ বাবার কবরে মাটি দেন।
দাফন শেষে মোনাজাতে অংশ নেন দীপু মনি, স্বজন, বন্ধু ও উপস্থিত নেতাকর্মীরা। বনানী গোরস্তান মসজিদের ইমাম মাওলানা ওমর ফারুক মোনাজাত পরিচালনা করেন। পরে ইমামকে ডেকে স্বামীর জন্য বিশেষভাবে দোয়া কামনা করেন দীপু মনি।
স্বামীকে দাফনের পর নিজের বাবা এম এ ওয়াদুদের কবরও জিয়ারত করেন দীপু মনি। ওয়াদুদ ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন।
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে বৃষ্টিভেজা বনানী কবরস্থান থেকে আবার প্রিজন ভ্যানে করে কারাগারের পথে রওনা হন দীপু মনি। মুন্সীগঞ্জের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দা নুরমহল আশরাফীর তথ্য অনুযায়ী, প্যারোলে মুক্তির নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টা ৫৮ মিনিটে তাঁকে আবার কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
তৌফীক নেওয়াজের বিদায়ে তাই একসঙ্গে সামনে এসেছে তাঁর আইনজীবী পরিচয়, শিল্পীমন, ক্রিকেটপ্রেম, নিভৃতচারী জীবন এবং দেশের স্বার্থে দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ের স্মৃতি। আলোচনার বাইরে থাকা এই মানুষটির জীবনের শেষ অধ্যায়টিও যেন ছিল তাঁর স্বভাবের মতোই- নীরব, সংযত; কিন্তু আপনজন ও সহকর্মীদের স্মৃতিতে গভীরভাবে ছাপ রেখে যাওয়ার মতো।


