বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা আজ মানবাধিকার রক্ষার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। একটি মামলায় জড়িয়ে পড়ার পর নির্দোষ প্রমাণিত হলেও বছরের পর বছর কারাভোগ করতে হচ্ছে অনেক মানুষকে। ফলে বিচার পাওয়ার আগেই জীবনের মূল্যবান সময়, পরিবার, কর্মজীবন, সবকিছু হারিয়ে ফেলছেন অসংখ্য নাগরিক।
প্রচলিত একটি রূপক গল্পে বলা হয়, বনে পুলিশ হাতি ধরতে এসেছে শুনে মহিষের পালও প্রাণভয়ে পালাতে শুরু করে। কারণ, ভুল করে যদি পুলিশ মহিষকে হাতি মনে করে গ্রেপ্তার করে, তবে সে যে হাতি নয়, এটি প্রমাণ করতেই তার সারাজীবন কেটে যেতে পারে। বিচারব্যবস্থার বর্তমান বাস্তবতায় এই গল্প যেন নির্মম সত্যে পরিণত হয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে কারা হেফাজতে ৬১ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ জনই ছিলেন বিচারাধীন বন্দি। গত বছর কারা হেফাজতে মারা যান ১০৭ জন, যাদের মধ্যে ৬৯ জন বিচারাধীন ছিলেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৫, যার মধ্যে ৪২ জন বিচারাধীন বন্দি।
বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোতে প্রায় ৮৩ থেকে ৮৫ হাজার বন্দি রয়েছেন, যা কারাগারের ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ। এসব বন্দির বড় অংশই বিচারাধীন। দীর্ঘদিন ধরে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ায় তারা বছরের পর বছর কারাগারে বন্দি জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।
ফৌজদারি কার্যবিধিতে পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য ৬০ দিন এবং আদালতভেদে ১৮০ থেকে ৩৬০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান থাকলেও বাস্তবে সেই সময়সীমা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানা হয় না। মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর কেটে গেলেও তদন্ত শেষ হয় না, বিচারও সম্পন্ন হয় না। ফলে সংবিধানে নিশ্চিত করা ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের অধিকার প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
বিচারিক দীর্ঘসূত্রতার ভয়াবহতার উদাহরণও কম নয়। সিলেটের মানসিক ভারসাম্যহীন ফজলু মিয়া কোনো অপরাধ ছাড়াই প্রায় ২২ বছর ৭ মাস কারাগারে কাটিয়েছেন। কমলা বানু উচ্চ আদালত থেকে খালাস পাওয়ার পরও আদেশ যথাসময়ে কারাগারে না পৌঁছানোয় অতিরিক্ত সাত বছর বন্দি ছিলেন। একইভাবে মিষ্টন মিয়া মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পরও নথিপত্রের জটিলতায় আরও ১১ বছর কারাগারে থেকে মোট ২৪ বছর বন্দিজীবন কাটান। এসব ঘটনা বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা ও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার করুণ চিত্র তুলে ধরে।
বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ মামলার বিশাল জট। ২০১৮ সালের ‘জাস্টিস অডিট’-এ দেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৭ লাখ। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৪৮ লাখে পৌঁছেছে। বিদ্যমান বিচারক, আদালত ও অবকাঠামো দিয়ে এই বিপুল মামলাজট দ্রুত নিষ্পত্তি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিচারব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে মামলার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিনির্ভর বিচারপ্রক্রিয়া, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর), দক্ষ মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ, আদালতে জনবল বৃদ্ধি এবং বিচারাধীন বন্দিদের মামলাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো উদ্যোগ জরুরি। পাশাপাশি ছোটখাটো অপরাধে কারাদণ্ডের পরিবর্তে প্রবেশন ও পুনর্বাসনমূলক ব্যবস্থা চালুর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আইনের শাসন কেবল সংবিধান বা আইনগ্রন্থে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটতে হবে মানুষের জীবনে। একজন নাগরিক অভিযুক্ত হলেও তার দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বিচার পেতে গিয়ে যেন আর কোনো নির্দোষ মানুষ জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় কারাগারের অন্ধকারে হারিয়ে না ফেলেন-এটাই প্রত্যাশা।


