একসময় ভারতের উত্তর প্রদেশের ছোট্ট জনপদ দেওবন্দে যে ধর্মীয় শিক্ষাধারার সূচনা হয়েছিল, দেড় শতাব্দী পর সেই দেওবন্দি বা কওমি শিক্ষার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী এবং সম্প্রসারণের দিক থেকে বর্তমানে ভারত ও পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে দেশের কওমি মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা।
দেশের বৃহত্তম কওমি শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বেফাক)-এর তথ্য অনুযায়ী, তাদের অধীনে বর্তমানে প্রায় ৩২ হাজার ৭৩০টি নিবন্ধিত মাদরাসায় অধ্যয়ন করছে প্রায় ৭০ লাখ শিক্ষার্থী। অন্যান্য কওমি বোর্ডের প্রায় ১০ হাজারের বেশি মাদরাসা যুক্ত করলে দেশে কওমি ধারার মোট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪০ হাজারেরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ভারতের অল ইন্ডিয়া দ্বীনি তালিমী বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ২০ হাজার ৯০০টি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী রয়েছে ২৩ লাখ ৭১ হাজার। পাকিস্তানের বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার অধীনে রয়েছে ২৭ হাজার ৪৮টি মাদরাসা এবং শিক্ষার্থী ২৪ লাখের বেশি। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের দেওবন্দি ধারার প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থীই এখন বাংলাদেশের কওমি মাদরাসায় অধ্যয়ন করছে।
শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, দ্রুত বাড়ছে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। বেফাকের তথ্য বলছে, চলতি বছর কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬ জন শিক্ষার্থী। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ২ লাখ ২৫ হাজার ৬৩১। মাত্র চার বছরে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ।
কওমি শিক্ষার এই বিস্তারের পেছনে বড় কারণ দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা। কম বা বিনা খরচে পড়াশোনা, আবাসিক সুবিধা এবং ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি অভিভাবকদের আগ্রহের কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই সন্তানদের কওমি মাদরাসায় পাঠাচ্ছেন।
তবে শিক্ষার এই বিস্তারের পাশাপাশি উঠে এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও। কওমি শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিস ২০১৮ সালে মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি পেলেও নিম্ন ও মধ্যম স্তর এখনো সরকারি স্বীকৃতির বাইরে। ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মূলধারার উচ্চশিক্ষা ও চাকরির বাজারে প্রবেশে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
কওমি শিক্ষার স্বকীয়তা বজায় রেখেই সরকারি নিবন্ধন, মান নিয়ন্ত্রণ, পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন এবং কর্মমুখী দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে কওমি শিক্ষাবিদদের একাংশের আশঙ্কা, সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়লে এ শিক্ষাব্যবস্থার স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা ক্ষুণ্ন হতে পারে।


