চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে আরও এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। নিহত শ্রমিকের নাম ইদ্রিস আলী (৫০)। গত বুধবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ নিয়ে ওই দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ জনে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম জানান, দুর্ঘটনার পর গুরুতর অসুস্থ ইদ্রিস আলীকে চট্টগ্রাম নগরের ন্যাশনাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে তিনি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বুধবার সন্ধ্যায় তাঁর মৃত্যু হয়। পরে মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়ি জামালপুরে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটির আরও তিনটি ব্যালাস্ট ট্যাঙ্কে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ও ঘন কালো স্লাজ বা তলানি শনাক্ত হয়েছে। গত মঙ্গলবার তদন্ত দল ও বিশেষজ্ঞ কমিটির যৌথ পরিদর্শনে বিষয়টি উঠে আসে।
সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় জাহাজটির মোট আটটি ব্যালাস্ট ট্যাঙ্কের ওপর ও নিচের স্তরের পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে তিনটি ট্যাঙ্কে ঘন কালো স্লাজ পাওয়া যায়।
পরিদর্শনের সময় জাহাজের খোলা অংশে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। তবে নমুনা সংগ্রহের সময় ট্যাঙ্কের পানি নড়াচড়া করায় তিনটি ট্যাঙ্কের ভেতরে ৮ থেকে ১৮ পিপিএম মাত্রায় হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়।
চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আশরাফ উদ্দিন জানান, মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত দল, জেলা প্রশাসনের তদন্ত দল, বিশেষজ্ঞ কমিটি, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। প্রশিক্ষিত কর্মীরা সুরক্ষা পোশাক পরে ট্যাঙ্কের কাছে গিয়ে গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করেন।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনার চার দিন পেরিয়ে যাওয়ায় জাহাজের খোলা অংশে হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। গ্যাস জোয়ারের পানিতে দ্রবীভূত হয়ে কিংবা বাতাসের সঙ্গে মিশে সরে যেতে পারে। ফলে বর্তমানে অক্ষত ট্যাঙ্কগুলোর ভেতরে গ্যাস রয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
সংগৃহীত পানি ও স্লাজের নমুনা পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার পর স্লাজের প্রকৃতি এবং পানিতে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিকের মাত্রা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর-চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক জমির উদ্দিন বলেন, জাহাজটি সারাদিনে কয়েক দফা পরিদর্শন করা হয়েছে। বর্তমানে জাহাজের খোলা অংশে কোনো গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। তবে নমুনা সংগ্রহের সময় তিনটি ট্যাঙ্কে হাইড্রোজেন সালফাইড শনাক্ত হয়েছে এবং পানিতে স্লাজের উপস্থিতিও দেখা গেছে।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) গঠিত তদন্ত দলের প্রধান ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী জানান, ল্যাবরেটরি পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর ‘প্রান্তিক মেরিন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ট্যাঙ্কগুলোর পানি ও তলানি অপসারণ এবং গ্যাসমুক্ত করার বিষয়ে একটি পরিকল্পনা জমা দেবে। বিশেষজ্ঞ কমিটি সেই পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
গত শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে সীতাকুণ্ডের ওই ইয়ার্ডে ‘এমটি রাসি’ নামে প্রায় ৩০ হাজার ৭৭০ টন ওজনের একটি স্ক্র্যাপ জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাঙ্ক কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন শ্রমিকরা। ঘটনাস্থলেই ও পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ছয়জন।
একই ঘটনায় নতুন করে আরও তিনটি ট্যাঙ্কে বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ায় জাহাজটির বাকি অংশ কাটার কাজ নিয়েও নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এখন তদন্ত প্রতিবেদন, ল্যাব পরীক্ষার ফল এবং বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনার ভিত্তিতেই পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারণ করা হবে।


