খাল-ঝিল, ফুটপাত থেকে পরিত্যক্ত ভবন- নগরীর বিভিন্ন প্রান্তে মিলছে পরিচয়হীন মরদেহ; পরিচয় শনাক্তে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কথাও বলছে সংশ্লিষ্টরা
রাজধানীর কোথাও খালে, কোথাও ঝিলে; কখনো ফুটপাতে, কখনো হাসপাতালের আশপাশে কিংবা পরিত্যক্ত ভবন ও নির্জন স্থানে পড়ে থাকছে মরদেহ। কোনো কোনো মরদেহে মিলছে আঘাতের চিহ্ন, আবার দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় পচন ধরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে পরিচয় শনাক্তের গুরুত্বপূর্ণ আলামত।
আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট- মাত্র আট মাসে রাজধানীতে ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহের দাফন ও সৎকার করা হয়েছে। এর মধ্যে রায়েরবাজার কবরস্থানে ৩২৬টি এবং জুরাইন কবরস্থানে ৭৪টি মরদেহ দাফন করা হয়। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৫০টি বেওয়ারিশ মরদেহের শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করেছে সংস্থাটি।
সর্বশেষ গত শুক্রবার রাজধানীর শ্যামপুর থানার জুরাইন রেলওয়ে সেতুর নিচে একটি পরিত্যক্ত পাবলিক টয়লেট থেকে আনুমানিক ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহটির মাথার অংশে পচন ধরে হাড় বেরিয়ে এসেছিল। কপালেও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। পুলিশের ধারণা, উদ্ধারের ১৫ থেকে ২০ দিন আগেই কিশোরটির মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। শ্যামপুর থানার ওসি নজরুল ইসলাম জানান, মরদেহে অতিরিক্ত পচন ধরায় সিআইডি ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করতে পারেনি। পরিচয় শনাক্তে এলাকায় প্রচারণা চালানো হলেও এখন পর্যন্ত কেউ কিশোরটির বিষয়ে তথ্য দিতে পারেনি।
আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ৩০টি, ফেব্রুয়ারিতে ৫৯টি, মার্চে ৫২টি, এপ্রিলে ৪৬টি, মে মাসে ৫৬টি, জুনে ৬৭টি, জুলাইয়ে ৪২টি এবং আগস্টে ৪৮টি বেওয়ারিশ মরদেহের দাফন বা সৎকার করা হয়েছে।
তবে এই ৪০০টি মরদেহকে রাজধানীতে উদ্ধার হওয়া মোট অজ্ঞাত মরদেহের সংখ্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, উদ্ধার হওয়ার সময় পরিচয় জানা না থাকলে একটি মরদেহ ‘অজ্ঞাত’ হিসেবে নথিভুক্ত হয়। পরে পুলিশ পরিচয় শনাক্ত ও স্বজনদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হলে সেটি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন বা সৎকারের ব্যবস্থা করা হয়।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চলতি বছর একাধিক অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা সামনে এসেছে। প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনগুলোর হিসাবে, শুধু শাহবাগ থানা এলাকাতেই চলতি বছরে অন্তত ১১টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। তবে রাজধানীতে অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে নেই।
অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তের ক্ষেত্রে সময় যত গড়ায়, ততই জটিল হয়ে পড়ে তদন্ত। নতুন অবস্থায় উদ্ধার হওয়া মরদেহ থেকে আঙুলের ছাপ, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, মোবাইল ফোন, পোশাক ও ব্যক্তিগত সামগ্রীসহ বিভিন্ন সূত্রে পরিচয় শনাক্তের সুযোগ থাকে। কিন্তু কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পড়ে থাকলে পচনের কারণে নষ্ট হয়ে যেতে পারে গুরুত্বপূর্ণ আলামত।
এ অবস্থায় ডিএনএ পরীক্ষা, সিসিটিভি ফুটেজ, নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য এবং স্বজনদের দেওয়া বর্ণনার ওপর নির্ভর করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব তথ্য বা প্রযুক্তিগত সহায়তাও সহজে পাওয়া যায় না।
আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুলিশের অনুমোদন ছাড়া কোনো মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয় না।
সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, পরিচয়হীন মরদেহের বিষয়টি শুধু আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।
তার মতে, নগরজীবনে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া, গৃহহীনতা, একাকিত্ব এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার মতো বিষয়গুলোর সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে। একই সঙ্গে কোনো মরদেহের পেছনে অপরাধ বা হত্যাকাণ্ড রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিনি পরিচয় শনাক্তে পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্যভান্ডার, হাসপাতাল, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তবে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক পরিচয়হীন মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা এবং মাত্র আট মাসে ৪০০ বেওয়ারিশ মরদেহের দাফনের তথ্য নগরীর নিরাপত্তা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ ব্যবস্থাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।


